জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান তাকে ‘টার্গেট’ করে শুরু করা হয়নি বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব সাইদুর রহমান খান।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুদকের এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ এবং কী ভিত্তিতে সেগুলো অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি দুদক সচিব। তিনি বলেন, ‘আজকের বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকি। এ বিষয়ে আমরা কথা না বলি।’
পরে সাইদুর রহমান খান বলেন, পাঁচ মাসের বেশি সময় কমিশন না থাকায় অনেক বিষয় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। এখন সেগুলো পর্যায়ক্রমে দেখা হচ্ছে। সময়মতো সব বিষয় সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা হবে।
আসিফ মাহমুদকে কেন অনুসন্ধানের আওতায় নেওয়া হয়েছে এবং অন্য সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ থাকলে একই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব বলেন, কাউকে লক্ষ্য করে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা এরকম কোনো টার্গেট করে করছি না। যেহেতু পেন্ডিং ছিল, পেন্ডিং লিস্ট অনুযায়ী আমরা এগুলো উপস্থাপন করছি।’ এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্য সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেগুলোও আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান দুদক সচিব। তার ভাষ্য, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো আইনানুগভাবে দেখা হচ্ছে এবং নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোববার দুদক জানায়, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেন, উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন নেওয়াসহ নতুন কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দুদকের নথিতে করা অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং ৩৬ জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের সময় উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়া এবং নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডারে সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের কথাও বলা হয়েছে। আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা কুমিল্লার মুরাদনগরের একটি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে ব্যয় বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা এবং এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগের বিনিময়ে ৬৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নথিতে চারটি নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিযোগ করা অর্থের পরিমাণ ১৮৭ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়, পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থান এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের অভিযোগও আনা হয়েছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের মধ্যে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অন্যরা হলেন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।
দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি দল ওই অনুসন্ধান করছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আসিফ মাহমুদের দায়িত্বকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত তথ্য-নথি চাওয়া হয়েছে।
তবে ৯ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি দুদকের অনুসন্ধানকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অংশ বলে দাবি করেন।
পদোন্নতি সংক্রান্ত একটি অভিযোগের বিষয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ১৩৫ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির আদেশ জারি হয়েছিল ২০২৬ সালের ১১ মে। সে সময় তিনি আর সরকারের দায়িত্বে ছিলেন না।
৩৮ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১১২ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছিল।
এ ছাড়া দুদকের উপপরিচালক আক্তারুল ইসলামের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে তাকে আইনি নোটিশও পাঠান আসিফ মাহমুদ।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন আসিফ মাহমুদ। পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দিয়ে দলটির মুখপাত্র হন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর