ভারতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে আসাদ আলম সিয়ামকে নিয়োগের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক সম্মতি দেয়নি নয়াদিল্লি। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্ট’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে নতুন হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এক মাসেরও বেশি সময় আগে আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে ভারতের অনুমোদন চাওয়া হয়। তবে ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনসের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রহণকারী দেশের সম্মতি ছাড়া কোনো কূটনৈতিক নিয়োগের সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা যায় না।
কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো প্রস্তাবিত কূটনীতিককে গ্রহণ না করার কারণ ব্যাখ্যা করতে বাধ্য নয় সংশ্লিষ্ট দেশ। এ ধরনের প্রক্রিয়া সাধারণত গোপন রাখা হয়, যাতে নিয়োগ প্রত্যাখ্যানকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি না হয়।
বর্তমানে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে তার। অন্যদিকে আসাদ আলম সিয়াম বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং দেশের অন্যতম জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক। এর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলমান শীতল সম্পর্কের মধ্যেই সিয়ামের নিয়োগে অনুমোদন আটকে থাকার বিষয়টি সামনে এলো। আগস্টে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়। এ ছাড়া বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ আমন্ত্রণ পেলেও গত সপ্তাহান্তে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেননি। ঢাকা থেকে কোনো প্রতিনিধিও পাঠানো হয়নি। সম্মেলনে ভারতের বর্তমান বাংলাদেশি হাইকমিশনার হামিদুল্লাহও অংশ নেননি।
তবে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে ঢাকায় দুই দিনব্যাপী আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠক (আইজিআরএম) অনুষ্ঠিত হয়। সীমান্ত পারাপারের ট্রেন চলাচল পর্যালোচনার জন্য দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর গত সাত মাসে দুই দেশের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দল ও কারিগরি পর্যায়ের প্রক্রিয়াও পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। তবে রাজনৈতিক শীতলতা সামগ্রিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গত এক মাসে বাংলাদেশকে দুটি আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নয়াদিল্লি—একটি রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য এবং অন্যটি ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। তবে কোনো আমন্ত্রণই বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের একটি প্রেস ব্রিফিংয়ের কারণে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রীয় সফরটি জটিল হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।
এদিকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের বিভিন্ন পথ খোঁজা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে ভারত দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। জুনের শেষ দিকে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা হিসেবে ভারতীয় প্রশাসনিক কাঠামোয় তার পদমর্যাদাও ‘ক্যাবিনেট পদমর্যাদায়’ উন্নীত করা হয়।
হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়। ওই সময়ে বাংলাদেশের কূটনীতিতে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর উদ্যোগও দেখা যায়।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা ইতিবাচক গতি দেখা দিলেও গত মাসে তা আবার থমকে গেছে। নয়াদিল্লি আশা করেছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন। তবে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলেই নতুন করে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জাতীয় এর সর্বশেষ খবর