কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা বড় আয়োজন ছাড়াই দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়েছে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) মালয়েশিয়ার সুপরিচিত সুপারমার্কেট চেইন এনএসকে ট্রেড সিটির চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সত্যায়ন করেছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। বিষয়টি হাইকমিশন ও বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড (আরএল-২০৬৮) নিশ্চিত করেছে।
চাহিদাপত্র সত্যায়নের মধ্য দিয়ে কার্যত দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম আবার শুরু হলো। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই বাজার খোলায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া, ব্যয় ও নিয়োগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী প্রবেশের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কর্মী নিয়োগে অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় ও বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া সরকার নতুন কর্মী প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছিল।
এরপর দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বাজারটি পুনরায় খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিয়ে বিশেষ বৈঠকে বন্ধ ও সংকুচিত শ্রমবাজারগুলো পুনরায় উন্মুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তার প্রথম বিদেশ সফরও ছিল মালয়েশিয়ায়। ওই সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরুর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পথ আবার উন্মুক্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দুই দেশের কোনো পক্ষ থেকেই শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
দালালচক্র নিয়ে উদ্বেগ
শ্রমবাজার খুললেও এবার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ স্বচ্ছ ও নিরাপদ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে। মালয়েশিয়া সরকার প্রায় এক মাস আগে বাংলাদেশসহ বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও ধাপ প্রকাশ করলেও বাংলাদেশে এসব তথ্য যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় চাকরিপ্রত্যাশীদের বড় একটি অংশ এখনো বিস্তারিত জানেন না।
এই সুযোগে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টাও চলছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে পাসপোর্ট জমা না দিতে, টাকা পরিশোধ না করতে এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করাতে পরামর্শ দিয়েছে। তবে ২৮ কর্মীর চাহিদাপত্র সত্যায়নের পরও কর্মী পাঠানোর পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য ব্যয় ও পরবর্তী ধাপ নিয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।
খরচ নিয়েও শঙ্কা
অতীতের অভিজ্ঞতায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে কর্মীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এবারও বাজারে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার আলোচনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সরকার নির্ধারিত ব্যয় এবং কর্মীদের প্রকৃত খরচের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
এদিকে বিশেষ ব্যবস্থায় বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। সরকারি ব্যবস্থায় কম খরচে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো নিশ্চিত করা গেলে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
ডাটাবেজভিত্তিক নিয়োগের দাবি
সরকার স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়ায় কর্মী নির্বাচন ও প্রেরণের জন্য ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম (ওইপি) চালু করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ডাটাবেজ ব্যবহার করে কর্মী নির্বাচন নিশ্চিত করা গেলে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অনিয়মও কমানো সম্ভব।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী, প্রথমে বিএমইটির ডাটাবেজ থেকে উপযুক্ত কর্মী নির্বাচন করার কথা। সেখানে উপযুক্ত কর্মী পাওয়া না গেলে সরকারের অনুমতি নিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কর্মী বাছাইয়ের বিধান রয়েছে।
অতীতে এই বিধান পুরোপুরি অনুসরণ না করার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি চাহিদাপত্র পাওয়ার আগেই কর্মী সংগ্রহ ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছিল। ফলে এবার শ্রমবাজার চালুর শুরু থেকেই আইনি কাঠামো ও সরকারি ডাটাবেজভিত্তিক কর্মী নির্বাচন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুললেও এর সুফল কতটা নিরাপদ ও স্বচ্ছভাবে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে পৌঁছায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অতীতের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকিয়ে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করাই সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর