হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলখ্যাত দিনারপুর পরগনায় আবারও রাতের আধারে বানিজ্যিক কারনে নতুন ভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। পাহাড়ের লাল মাটি বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে ঢাকা সিলেট মহাসড়কের পাশে একটি বিদ্যূৎ প্লান্টে। অন্যদিকে ঝুঁকি বাড়ছে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের।
বাড়ি নির্মানের অনুমতি নিয়ে বিশাল পাহাড় গতকাল শুক্রবার (২ অক্টোবর) দিবাগত রাতে এক্সভেটর মেশিন দিয়ে কাটার সময় স্থানীয় জনতা বাঁধা প্রদান করেন। কিন্তু পাহাড় খেকোদের কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না।
নবীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন বলছে তারা কোথায় টিলা বা পাহাড় কাটার অনুমতি দিতে পারেন না। তারা শুধু বাড়ি নির্মানের জন্য একটি আবেদন করলে একজনকে শ্রেনী পরিবর্তন না করে পাহাড়ে একটি বাড়ি নির্মানের অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু উক্ত অনুমতি পত্র দিয়ে বানিজ্যিক ভাবে পাহাড় কাটার খবর পেয়ে তারা উক্ত অনুমতি স্থগিত করে পাহাড় কাটা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের নজর এড়াতে গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে রাতভর দিনারপুর আইনগাঁও এলাকায় জনৈক্য আব্দুল আহাদ এর মেয়ে রুনু বেগম এর লোকজন রাতের আধারে এক্সভেটর মেশিন দিয়ে দেদার পাহাড় কাটা হয়। উক্ত রুনু বেগম সম্প্রতি নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট আবেদন করেন, একটি টিলায় বসত বাড়ি নির্মানের জন্য এর প্রেক্ষিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন অনুমতি প্রদান করেন। তাতে তিনি লিখেন যে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩( সংশোধনী এর ৭(ক) ধারা মোতাবেক শ্রেনী পরিবর্তন না করার শর্তে শুধু মাত্র বসত বাড়ি নির্মানের জন্য সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দেয়া হলো। তিনি উক্ত অনুমতি পেয়ে ঢাকা সিলেট মহাসড়কের পাশে নতুন নির্মিত বিদ্যূৎ প্লান্টের মধ্যে পাহাড়ের লাল মাটি বিক্রি করেন।
গতকাল শুক্রবার সরকারী ছুটির দিনের রাতে মেশিন লাগি ড্রাম ট্রাক দিয়ে মাটি বিক্রি করেন। এসময় ডাম ট্রাকের আঘাতে গ্রামের চলাচলের সড়কটি সম্পূর্ন ভেঙ্গে যায়। পরে গ্রাম বাসী ঘটনাটি নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে তিনি রাতেই উক্ত পাহাড় কাটার কাজ বন্ধ করে দেন। স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উদাসীনতা ও দায়িত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলিতে এমন কার্যক্রম চলছে। জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদেরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া, গজনাইপুর ও পানিউমদা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত দিনারপুর পরগনা। এটি উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ২০১৫ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামে একটি পরিবেশবাদী সংগঠন দিনারপুর এলাকার টিলা ও পাহাড় না কাটার জন্য হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। এ ব্যাপারে হাইকোর্ট স্থিতাবস্থা দিয়ে রুল জারি করেন। রুল শুনানি শেষে চূড়ান্ত রায়ে নবীগঞ্জের দিনারপুরে পাহাড় ও টিলা কাটা রোধে প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তাকে অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া তৎকালীন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারকে পাহাড় ও টিলা সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে বছরের অধিকাংশ সময়জুড়ে দিনারপুর এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কেটে মাটির রমরমা ব্যবসা করছে একটি অসাধু চক্র। সরজমিনে এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ২ অক্টোবর রাত থেকে দেবপাড়া ইউনিয়নের আইনগাঁও গ্রামে একটি বৃহৎ পাহাড় কাটা শুরু হয়।
আইনগাঁও গ্রামের আব্দুল্লাহ বলেন, গ্রামের প্রভাবশালীরা রুনু বেগমের নামে অনুমতি এনে , সালেহ,শায়েম, আউয়াল, আশরাফ আলী, তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সংঘবদ্ধ চক্র এই পাহাড় থেকে এক্সকাভেটর (ভেকু) মেশিনের সাহায্যে মাটি কাটছে। পরে ট্রাকভর্তি মাটি বিক্রি করা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী বিদ্যূতের কোম্পানির কাছে। আমাদের রাস্তাঘাট সব ভেঙ্গে গেছে আমরা প্রতিবাদ করলে তারা শুনছে না আরও আমাদেরকে মারার হুমকি দিচ্ছে।
মুরব্বি আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, পাহাড় কাটার ফলে আশপাশের বাড়িঘর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে থেমে থেমে পাহাড় কাটা হলেও স্থানীয় প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিতেছে না।
গজনাইপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারন সম্পাদক আবুল খায়ের কায়েদ বলেন, আমাদের এলাকায় এভাবে রাতের আধারে পাহাড় কাটা ভয়ংকর জিনিস। আইনগাও যারা পাহাড় কাটছে, তারা হলো রাজু, সালেহ,শায়েম,আউয়াল,গংরা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কাটছে। রাজুগংদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা আছে। এদের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা না নিলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটার আশংকা রয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসনের নজর এড়াতে সরকারি ছুটির দিনকে বেছে নেয় পাহাড়খেকোরা। ছুটির দিনে রাতভর কাটা হয় পাহাড়।
জানতে চাইলে অভিযুক্ত রুনু বেগম বলেন, ‘প্রয়োজনে আমার মালিকানাধীন পাহাড় থেকে মাটি কাটছি, মাটি পার্শ্ববর্তী বিদ্যূত অফিসে আমার দেবররা বিক্রি করছে। আমি বাড়ি নির্মানের অনুমতি পেয়েছি, কিন্তু ব্যবসার জন্য মাটি বিক্রি করা নিষেধ জানিনা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, বাহুবল, চুনারুঘাট ও মাধবপুরে পাহাড়, টিলা কেটে পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম চলছে বহু বছর ধরে। এতে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। নবীগঞ্জে প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটা হলেও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যত কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করা যায় না, দ্রুত দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থাসহ পাহাড়-টিলাকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।’ আর না হয় পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেব রায় বলেন, রাতে পাহাড় কাটার অভিযোগ পেয়ে কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি। রুনু বেগম যদি বাড়ি নির্মানে অনুমতি নিয়ে মিস ইউজ করেন তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাকে পাহাড় কাটার অনুমতি দেয়া হয়নি।
নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন বলেন, আমরা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩( সংশোধনী এর ৭(ক) ধারা মোতাবেক শ্রেনী পরিবর্তন না করার শর্তে শুধু মাত্র বসত বাড়ি নির্মানের জন্য সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দিয়েছি, এখাণে পাহাড় বা টিলা কাটার কোন অনুমতি দেয়া হয়নি। সে যদি আমাদের অনুমতির বাহিরে গিয়ে কোন কাজ করে থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমাদের টিলা বা পাহাড় কাটার অনুমতি দেয়ার অধিকার নেই। সরজমিন তদন্ত করে যথাযত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার অনুমতি পত্র স্থগিত করা হয়েছে, তাকে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে এর পর কাজ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর