গ্রামবাংলার লোকজীবনের সঙ্গে একসময় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল বাঁশের তৈরি নানা ধরনের সামগ্রী। ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হতো বাঁশের হাতপাখা, কুলা, ডালা, ঝুড়ি, মাছ ধরার চাঁই ও চালুনি। গৃহস্থালি জীবনের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি এসব পণ্য ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ। তবে কালের পরিক্রমায় সেই পরিচিত দৃশ্য আজ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
প্লাস্টিকপণ্যের সহজলভ্যতা, কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখী দাম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উপযুক্ত বাজারের অভাবে জামালপুরের শতবর্ষী ঐতিহ্যের বাঁশশিল্প এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেক কারিগরই পূর্বপুরুষের এই পেশা ছেড়ে বিকল্প জীবিকা বেছে নিচ্ছেন।
সম্প্রতি জামালপুর জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় বাঁশজাত পণ্যের দোকান ও ক্রেতা—দুটির সংখ্যাই কমেছে। বাজারজুড়ে এখন প্লাস্টিকপণ্যের আধিপত্য। এর প্রভাব পড়েছে পরিবেশবান্ধব বাঁশপণ্যের চাহিদায়ও।
কারিগরদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও কুলা, ডালা, ঝুড়ি, হাতপাখা, চালুনি ও মাছ ধরার সরঞ্জামের ভালো চাহিদা ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাঁশের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। সেই তুলনায় পণ্যের দাম বাড়েনি। ফলে শ্রমের যথাযথ মূল্য পাওয়া তো দূরের কথা, অনেক সময় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
প্রায় ৪০ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত কারিগর রানা পাল বলেন, “আগে এই কাজ করেই সংসারের সব খরচ চলত। এখন আগের মতো বিক্রি নেই। নতুন প্রজন্মও এ পেশায় আগ্রহী নয়। তারা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।”
প্রায় তিন দশক ধরে এ কাজে যুক্ত সীমান্ত চন্দ্র রায় ও প্রবীণ কারিগর শাহেদ পালও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁদের ভাষ্য, লাভের আশায় নয়, বরং পারিবারিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতেই তাঁরা এখনো এ পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন।
কারিগর নিখিল সরকার বলেন, “সংসারের অভাবের কারণে বড় ছেলেকে অন্য পেশায় পাঠাতে হয়েছে। শুধু বাঁশের কাজ করে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।”
তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও নতুন সম্ভাবনার পথ খুঁজছেন কয়েকজন উদ্ভাবনী কারিগর। তাঁদের একজন আমিনুল ইসলাম আধুনিক নকশা ও আকর্ষণীয় রঙে বাঁশপণ্য তৈরি করে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, “মানুষের রুচি বদলেছে। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরি করছি। এতে বিক্রি আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে, লাভও হচ্ছে।”
তরুণ উদ্যোক্তা শোয়েব হোসেন বলেন, “বাঁশশিল্প শুধু একটি কুটিরশিল্প নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক নকশা, অনলাইন বিপণন এবং দেশে-বিদেশে বাজার সৃষ্টি করা গেলে এই শিল্প আবার সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে।”
স্থানীয় কারিগরদের মতে, বাঁশশিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন কারিগরদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, সরকারি ক্রয়নীতিতে দেশীয় পরিবেশবান্ধব পণ্যকে অগ্রাধিকার এবং পরিকল্পিতভাবে বাঁশের বাণিজ্যিক চাষে উৎসাহ দেওয়া।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) জামালপুর কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক সম্রাট আকবর বলেন, “বাঁশশিল্পের আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। বিসিকের মাধ্যমে কারিগরদের দক্ষতা উন্নয়নে তিন মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ঋণ সহায়তা ও নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আগ্রহী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত।”
পরিবেশদূষণ কমাতে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহারে গুরুত্ব বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় দেশের ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্পকে টিকিয়ে রাখা সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের মতে, কার্যকর সরকারি উদ্যোগ, সহজ অর্থায়ন, আধুনিক বিপণনব্যবস্থা ও জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে জামালপুরের বিলুপ্তপ্রায় এই শিল্প আবারও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। অন্যথায় শত বছরের এই ঐতিহ্য একসময় কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর