ভোরের আলো ফুটতেই পটুয়াখালীর বাউফলে তেঁতুলিয়া নদীর বুকে নৌকা নিয়ে বের হন জেলে মোশারফ। হাতে জাল, চোখে ইলিশ পাওয়ার প্রত্যাশা। একসময় এই মৌসুমে জাল ফেললেই রুপালি ইলিশে ভরে উঠত নৌকা। কিন্তু এখন সেই একই নদীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলে অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না।
জেলে মোশারফ বলেন, ‘আমাদের সংসার ও জীবন নদীর ওপর নির্ভরশীল। আগে বর্ষাকাল থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ভরা মৌসুমেও নদীতে মাছ নেই।’
বাউফলের তেঁতুলিয়া নদীতে ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় এমন হতাশা এখন অনেক জেলেরই। এর মধ্যেই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিষিদ্ধ জালে চলছে নির্বিচারে মাছ শিকার। সাধারণত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসকে ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে ইলিশের কাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি না থাকায় জেলেদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। পাশাপাশি ছোট ফাঁসের জাল ও অন্যান্য ক্ষতিকর জালে মাছ শিকারের ফলে ইলিশসহ দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে। অর্থাৎ, তিন বছরের ব্যবধানে বরিশাল বিভাগে ইলিশের উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন।
উপজেলার নদীগুলোতে সরেজমিনে দেখা গেছে, ছোট ফাঁসের বাঁধা জাল, কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি ও মশারি জাল পেতে মাছ শিকার করা হচ্ছে। চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চরকচুয়া, চর রায়সাহেব, চর ব্যারেট ও চর নিমদি এলাকায় এসব জালে ইলিশের পোনার পাশাপাশি গলদা চিংড়ি, পাঙ্গাশ, আইড় ও বোয়ালসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ ধরা পড়ছে। একই চিত্র দেখা গেছে বগা, কাছিপাড়া, কারখানা, ধুলিয়া ও বাঁশবাড়িয়ার নদীসংলগ্ন বিভিন্ন পয়েন্টেও।
জেলে মামুন ও মাঈনুদ্দিন মাঝী জানান, নদীর প্রধান মোহনায় বাঁধা জাল পাতার পাশাপাশি গভীর সাগরে ট্রলিংয়ের কারণে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। নদীতে মাছ কম থাকায় দাদনের টাকা পরিশোধ ও শ্রমিকের মজুরি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় আড়তদার বেল্লাল হোসেন জানান, ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় বাজারে এর দামও বাড়ছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিযানে প্রায় ১৫শ থেকে ২ হাজার চায়না দুয়ারি জাল ও বেশ কিছু বাঁধা জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। এসব জালের আনুমানিক বাজারমূল্য ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
বাউফল উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, ‘চায়না দুয়ারি ও নির্দিষ্ট ফাঁসের নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা আইনত দণ্ডনীয়। জনবল সংকট থাকলেও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নদীতে নাব্যতা সংকট ও প্রধান মোহনা শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে।’
এদিকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম সামনে রেখে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
বগা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. জয়নাল আবেদীন জানান, মৎস্য অফিসের সাথে সমন্বয় করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং নিষিদ্ধ জালের কেনাবেচায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ জানান, নিষিদ্ধ জাল নির্মূলে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি বৃদ্ধির জন্য মৎস্য দপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম জানান, অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে আইন অনুযায়ী নিয়মিত মামলা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ‘নিষিদ্ধ জালে নির্বিচারে মাছ আহরণে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তার ব্যাহত হয়। জেলায় প্রায় ১৯টি নদী থাকায় জনবল সংকটের কারণে সব এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালানো কঠিন। তবে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘অবৈধ জালে ছোট-বড় সব মাছ ধরা পড়ায় পরবর্তী বংশবিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় মা মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এছাড়া নদীতে বর্জ্য, পলিথিন ও ডুবোচরের কারণে মাছের চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে।’
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর