পঞ্চগড়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মৃত্যু ঘিরে নানা অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেছেন এলাকাবাসীর একাংশ। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ওই শিক্ষকের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
ঘটনাটি পঞ্চগড় সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের মিরগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর আজমকে ঘিরে। গত ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে মিরগড় বাজারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
পরদিন ৬ অক্টোবর দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় কয়েকজন। এ সময় প্রধান শিক্ষকের মৃত্যুর জন্য বিদ্যালয়ের তিন সহকারী শিক্ষক—আতাউর রহমান, আকলিমা আকতার ইতি ও সাহাজুল ইসলামকে দায়ী করা হয়। বিক্ষোভের পর ওই তিন শিক্ষককে তাৎক্ষণিকভাবে নৈমিত্তিক ছুটিতে পাঠানো হয়।
৭ অক্টোবর সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষাকার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক আফরোজা বানু বলেন, গত তিন মাসে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে অন্য শিক্ষকদের কোনো বিরোধ তার নজরে আসেনি। প্রধান শিক্ষকের মৃত্যুর সঙ্গে বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক জড়িত নন বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, হঠাৎ করে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে মাঠে বিক্ষোভ করেন। তার ভাষ্য, সহকারী শিক্ষক আতাউর রহমান, আকলিমা আকতার ইতি ও সাহাজুল ইসলাম নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতেন এবং তাদের সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের কোনো বিরোধ ছিল না।
আফরোজা বানু আরও বলেন, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে মিরগড় বাজারে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা লুৎফা পারভিন, রমজিনা আকতার ও শেলিনা বেগমও প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তাদের কোনো বিরোধ ছিল না বলে জানান।
বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম তাহা বলেন, আতাউর স্যার, ইতি ম্যাডাম ও সাহাজুল স্যার যত্নসহকারে তাদের ক্লাস নিতেন এবং ভালোভাবে পড়াতেন। একই ধরনের কথা জানায় তৃতীয় শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া তাবাসসুম।
সহকারী শিক্ষক আতাউর রহমান বলেন, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল এবং তারা সব সময় হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই থাকতেন। কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
আতাউর রহমান জানান, তিনি একসময় অন্য বিদ্যালয়ে বদলির জন্য আবেদন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকায় নুর আজম তাকে বদলি না হয়ে আরও কিছুদিন একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেছিলেন।
অন্য অভিযুক্ত শিক্ষক আকলিমা আকতার ইতি বলেন, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। তবে তাকে অভিযুক্ত করার পেছনে বিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক কাম নৈশপ্রহরী সুজাত বাদশার সঙ্গে আগের একটি বিরোধ থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন। প্রায় এক মাস আগে সুজাত বাদশা তাকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক আফরোজা বানু জানান, সম্প্রতি বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন নিয়েও এলাকায় আলোচনা ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় রুহুল আমীনের স্ত্রী জান্নাত আরা সভাপতি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে সদস্যরা সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষক সোলায়মানকে সভাপতি নির্বাচিত করেন। যদিও ওই কমিটি এখনো অনুমোদন পায়নি বলে জানান তিনি।
বিক্ষোভের সময় পঞ্চগড় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মিরগড় এলাকার বাসিন্দা হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন বলে জানান তিনি। সাংবাদিকদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় কিছু এনসিপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী সেখানে এক ধরনের জটলা তৈরি করেছিলেন।
তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকের মৃত্যুর সঙ্গে কোনো শিক্ষকের সম্পৃক্ততা থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে অন্যত্র বদলি করা যেতে পারে।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানুল্লাহ বলেন, নুর আজমকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসা শুরু করার পরপরই তার মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে হৃদরোগেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
অন্যদিকে, নিহত প্রধান শিক্ষক নুর আজমের স্বজনদের দাবি, ধাক্কামারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আওরঙ্গজেব কিছুদিন আগে নুর আজমকে তার বাসায় ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রধান শিক্ষক নুর আজমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা রয়েছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর