এক হাতে উপড়ে ফেলা নারকেলগাছ, শরীরজুড়ে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট আর নানা ধরনের বর্জ্য। প্রায় ৫০ ফুট উচ্চতার দানবটি যেন সমুদ্রের বুক চিরে উঠে এসেছে। তার অবয়বে ভয়, বিকৃতিতে অস্বস্তি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কোনো দুঃস্বপ্নের দৃশ্য। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি রূপকথার কোনো দানব নয়, বরং মানুষের অসচেতনতারই এক বিশাল প্রতিচ্ছবি।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা ও সিগাল পয়েন্টের মাঝামাঝি বেলাভূমিতে দাঁড়ানো এই প্লাস্টিক দানবের সামনে থমকে দাঁড়াচ্ছেন পর্যটকেরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ আবার মুঠোফোনে বন্দি করছেন ব্যতিক্রমী শিল্পকর্মটি। কিন্তু ভাস্কর্যটির মূল বার্তা ছবির চেয়েও গভীর। মানুষ যে প্লাস্টিক ব্যবহার করে ফেলে দিচ্ছে, সেই বর্জ্যই একসময় সমুদ্র, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে নির্মিত ভাস্কর্যটি প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান। আগামী চার মাস ধরে চলবে এই প্রদর্শনী।
আয়োজকদের আশা, এ সময়ে কয়েক লাখ পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের কাছে সমুদ্রদূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরা সম্ভব হবে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন সৈকতসহ সমুদ্র উপকূল থেকে সংগ্রহ করা পাঁচ মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে ভাস্কর্যটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পীরা টানা ২০ দিনের পরিশ্রমে এটি নির্মাণ করেছেন।
ভাস্কর্যটির হাতে উপড়ে ফেলা নারকেলগাছের প্রতীকী উপস্থিতি পরিবেশের ওপর মানুষের ধ্বংসাত্মক প্রভাবের কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্লাস্টিকের তৈরি দানবটি যেন একদিকে প্রকৃতিকে গ্রাস করছে, অন্যদিকে মানুষের ফেলে দেওয়া বর্জ্য দিয়েই নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
এটি শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, বরং ভোগবাদী জীবনযাপন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মানুষের দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ। প্রতিদিন ব্যবহৃত পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট কিংবা অন্যান্য প্লাস্টিকপণ্য ব্যবহারের পর কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে খুব কম মানুষই ভাবেন। অথচ এসব বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা না হলে তা শেষ পর্যন্ত নদী, সমুদ্র ও উপকূলীয় পরিবেশে জমা হতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, সমুদ্র বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষের অসচেতনতার কারণে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিনিয়ত সমুদ্র ও সৈকতের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে।
তার ভাষ্য, এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দূষণের ভয়াবহতা মানুষের সামনে দৃশ্যমান করে তুলবে এবং নিজেদের আচরণ পরিবর্তনে উৎসাহিত করবে। কক্সবাজারকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সৈকতে ঘুরতে আসা স্থানীয় দর্শনার্থী সাদিয়া সুমাইয়ার কাছে প্লাস্টিক দানবটি পরিবেশদূষণের এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, কয়েক দশক ধরে সহজলভ্য প্লাস্টিকপণ্য পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা এই ভাস্কর্য দেখলেই বোঝা যায়। অথচ মানুষ সাধারণত বিষয়টি এভাবে চিন্তা করে না।
সাদিয়ার পর্যবেক্ষণ, গত কয়েক বছর ধরে এ এলাকায় এ ধরনের দানব তৈরি করা হচ্ছে। মানুষ ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেসব ছবি ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তাতে সচেতনতার কতটা পরিবর্তন হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, ভাস্কর্যটি দেখে যাওয়ার পরও যদি মানুষ সৈকতে ময়লা ফেলে, তাহলে উদ্যোগটির উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। সমুদ্রে বা সৈকতে বর্জ্য ফেলার আগে যদি মানুষের এই দানবটির কথা মনে পড়ে, তবেই এর নির্মাণ সার্থক হবে।
নোয়াখালী থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক রবি আলমও মনে করেন, প্লাস্টিক দানব মানুষের নিজেদের কাজের পরিণতি বুঝতে সাহায্য করছে।
তিনি বলেন, পর্যটকেরা সৈকতে এসে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলে পরিবেশ নোংরা করেন। অথচ মানুষের ফেলে দেওয়া সেই প্লাস্টিক দিয়েই তৈরি হয়েছে এই দানব। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, মানুষের সামান্য অসচেতনতাও পরিবেশের জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
সাভার থেকে আসা পর্যটক হেলাল উদ্দিনের মতে, কক্সবাজারের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর স্থানে প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের বর্জ্য ফেলা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিনে প্লাস্টিকবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কক্সবাজারে বছরজুড়ে চালু রয়েছে ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ স্টোর’। সেখানে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক জমা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সংগৃহীত প্লাস্টিকের একটি অংশ ব্যবহার করা হয়েছে এবারের ভাস্কর্য নির্মাণে। অর্থাৎ, পরিবেশের জন্য বোঝা হয়ে ওঠা বর্জ্যকে সচেতনতা তৈরির উপকরণে রূপান্তরের চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের পরিচালক জামাল উদ্দিন বলেন, মানুষ প্রায়ই সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করে, কিন্তু সেই সমুদ্রকে দূষিত করার পেছনে নিজেদের ভূমিকার কথা ভুলে যায়। পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি দানবটি মানুষের সেই অসচেতনতারই প্রতিচ্ছবি।
তার ভাষ্য, তারা চান না মানুষ শুধু ভাস্কর্যটি দেখে ছবি তুলে চলে যাক। বরং প্রত্যেকে যেন নিজের কাছে প্রশ্ন করে, ব্যবহৃত প্লাস্টিক কোথায় ফেলছে এবং সেই বর্জ্য সমুদ্রের জন্য কী ধরনের ক্ষতি তৈরি করছে।
বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবক মুহাম্মদ মুবারক বলেন, ৫০ ফুট উচ্চতার এই দানব তৈরিতে পাঁচ টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। এর হাতে গাছ উপড়ে ফেলার প্রতীকী দৃশ্যের মাধ্যমে পরিবেশ ও অক্সিজেনের উৎসের ওপর দূষণের হুমকি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্লাস্টিক দূষণের কারণে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে, তা অনেক সময় মানুষের চোখে সরাসরি ধরা পড়ে না। সেই অদৃশ্য বিপর্যয়কে দৃশ্যমান করাই ভাস্কর্য নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
আয়োজকদের মতে, প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকী ভাস্কর্যের মাধ্যমে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক কীভাবে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে, তা তুলে ধরা হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা তৈরি করাও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
ভাস্কর্য প্রদর্শনের পাশাপাশি সৈকতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি বিশেষ থিয়েটার। সেখানে ‘দায়িত্বশীল পর্যটন’ বিষয়ে সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হবে। চলচ্চিত্র দেখতে দর্শনার্থীদের প্রবেশমূল্য হিসেবে সঙ্গে আনতে হবে দুটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল। এর মাধ্যমে বিনোদনের সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের গুরুত্বও তুলে ধরতে চান আয়োজকেরা।
তাদের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ পর্যটকদের কাছে বর্জ্য সংগ্রহকে কেবল পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজ হিসেবে দেখার প্রবণতা বদলাতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ব্যবহৃত প্লাস্টিক যথাযথ স্থানে জমা দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখবে।
জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান জানান, জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এর আগেও কক্সবাজারে পরিবেশদূষণবিরোধী প্রতীকী আন্দোলন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
প্লাস্টিক দূষণ রোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনিক উদ্যোগও জরুরি বলে মনে করেন ঢাকার পর্যটক চিকিৎসক আবিদ আজাদ।
তিনি বলেন, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং পরিবেশদূষণ রোধে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সরকারের উদ্যোগে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য সরকার ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে সৈকতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে সচেতনতামূলক প্রচারের পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটকদের ব্যবহারের উপযোগী পর্যাপ্ত বর্জ্য ফেলার স্থান, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং নিয়ম ভাঙলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে প্রতীকী উদ্যোগের প্রভাব সীমিত থেকে যেতে পারে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলমের মতে, সৈকতের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যটি মানুষের ফেলে দেওয়া বর্জ্যের পরিণতির প্রতীক। মানুষ যদি এটি দেখে প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতন হয় এবং বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলে, তাহলেই উদ্যোগটির উদ্দেশ্য সফল হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা দানবটি হয়তো কয়েক মাস পর সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পরিণতি তত দিনে শেষ হয়ে যাবে না। বরং সেই বর্জ্যের প্রভাব থেকে যাবে সমুদ্রের পানি, উপকূলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর