মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রেস সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় দায়িত্ব হারিয়েছেন কেটি জাকারিয়া। তাঁর নিয়োগ ও আকস্মিক বিদায়ের পেছনে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাইয়ের অভাব, দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতিতে ঘাটতি এবং হোয়াইট হাউসের ভেতরে অসন্তোষের বিষয়গুলো উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে সিএনএন।
প্রতিবেদনটিতে হোয়াইট হাউসের একাধিক কর্মকর্তা ও ট্রাম্পের উপদেষ্টার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই পদে জাকারিয়ার নিয়োগের আগে তাঁর যোগ্যতা ও প্রস্তুতি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলনও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। এতে প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন ওঠে, ‘কেউ কি তাঁকে নিয়োগের আগে যাচাই করেছিলেন?’
আকস্মিক নিয়োগ, দ্রুত বিদায়
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সাবেক প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট গ্রীষ্মের শেষ দিকে দায়িত্ব ছাড়ার পর নতুন কাউকে নিয়োগ দিতে শুরুতে তেমন তাড়াহুড়া করেননি প্রেসিডেন্ট। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় ট্রাম্প নিজের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেওয়ার মতো একজন মুখপাত্র খুঁজতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
এ সময় টেলিভিশনে নিয়মিত উপস্থিত হয়ে ট্রাম্পের নীতির পক্ষে কথা বলা জাকারিয়ার নাম সামনে আসে। সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে নিয়ে আগ্রহ দেখান ট্রাম্প নিজেই। এ ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস এবং সাবেক প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটের পরামর্শও নেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহের বুধবার জাকারিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনে কথা হয়। পরদিন তিনি ওয়াশিংটনে যান। শুক্রবার ওভাল অফিসে আলোচনার সময় ট্রাম্প তাঁকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রেস সচিবের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে ওই আলোচনায় ওয়াইলস উপস্থিত ছিলেন না বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই বিপত্তি
দায়িত্ব নেওয়ার পর জাকারিয়ার প্রথম সংবাদ সম্মেলনই তাঁর জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং কক্ষে তাঁর প্রায় ১৪ মিনিটের উপস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁর দ্বিধাগ্রস্ত উপস্থাপনা এবং প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও সমালোচনা হয়।
সিএনএনের বরাতে জানা যায়, সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতিও ছিল অপ্রতুল। ব্রিফিংয়ের মাত্র ৯০ মিনিট আগে তাঁর বক্তব্যের উপকরণ চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে প্রস্তুতির জন্য তাঁকে ভোর ৩টায় উঠতে হয়েছিল।
একাধিক ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার মতে, প্রেস সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তাঁর উপস্থাপনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন উপদেষ্টা পরিস্থিতি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন, ‘ওখানে আসলে কী হচ্ছে?’
ট্রাম্প প্রথমে সন্তুষ্ট থাকলেও বদলে যায় পরিস্থিতি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলাস্কাগামী এয়ার ফোর্স ওয়ানের সাত ঘণ্টার যাত্রায় ট্রাম্প জাকারিয়াকে জানিয়েছিলেন, তাঁর কাজ ভালো হয়েছে। এটি ছিল জাকারিয়ার এয়ার ফোর্স ওয়ানে প্রথম যাত্রা।
তবে পরবর্তী কয়েক দিনে তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলন এবং অন্যান্য উপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যেই তাঁর বিদায় ঘটে।
ট্রাম্প পরে বলেন, তিনি জাকারিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই দায়িত্ব তাঁর জন্য উপযুক্ত কি না। তাঁর ভাষায়, ‘সত্যি বলতে, তোমার এই দায়িত্বের প্রয়োজন নেই।’
নিয়োগের পেছনে ছিল ট্রাম্পের রাজনৈতিক উদ্বেগ
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনা নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ এবং ট্রাম্পের ওপর বাড়তে থাকা রাজনৈতিক চাপ তাঁর অসন্তোষ বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট মনে করছিলেন, তাঁর পক্ষে যথেষ্ট জোরালোভাবে কথা বলার মতো কেউ নেই।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের পরিবর্তে টেলিভিশনে তাঁর পক্ষে কথা বলা একজন অনুগত সমর্থককে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। এর আগে সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থীর নাম বিবেচনায় এলেও তাঁদের কেউ কেউ অতীতে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন। ফলে তাঁদের নিয়োগের সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য
এদিকে, সিএনএনের প্রতিবেদনের বিষয়ে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চেউং জল্পনাকে ‘কল্পনাপ্রসূত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, জাকারিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখন তিনি অন্য ভূমিকায় প্রেসিডেন্টকে সহায়তা করবেন। তিনি জাকারিয়াকে ‘অসাধারণ সহকর্মী ও প্রতিভাবান’ বলেও উল্লেখ করেন।
জাকারিয়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করাকে সম্মানের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, আরও বেশি আমেরিকানের উচিত ট্রাম্পকে মূল্যায়ন করা।
সব মিলিয়ে, সিএনএনের প্রতিবেদনে জাকারিয়ার নিয়োগ ও বিদায়ের ঘটনাকে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে তাঁর বিদায়ের বিষয়ে হোয়াইট হাউসের প্রকাশ্য বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর