২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারলেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল জয় ঘিরে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম আবেগ। ঐতিহাসিক সেই ম্যাচে জয়সূচক গোল করেছিলেন লাউতারো মার্তিনেজ। এবার সেই ম্যাচের নেপথ্যে থাকা আবেগ ও দলের অন্দরমহলের পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুললেন আর্জেন্টিনার এই তারকা স্ট্রাইকার। তাঁর কথায়, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচটি শুধুমাত্র ফুটবলের লড়াই ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিরোধও।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ রয়েছে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে। আর্জেন্টিনায় দ্বীপপুঞ্জটি মালভিনাস নামে পরিচিত। লাউতারোর দাবি, এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে আর্জেন্টিনা দলের মধ্যে বাড়তি আবেগ ও অনুপ্রেরণা তৈরি করেছিল। নিজের জয়সূচক গোলটি তিনি উৎসর্গ করেছেন ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধে অংশ নেওয়া আর্জেন্টিনার সেনাদের।
যুদ্ধের সৈনিকদের উৎসর্গ জয়সূচক গোল
আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্থা এএফএ স্টুডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন লাউতারো। তাঁকে একটি ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে মালভিনাস যুদ্ধে অংশ নেওয়া এক আর্জেন্টাইন সৈনিক তাঁর গোল উদ্যাপন করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন।
সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে লাউতারো জানান, দেশের জন্য যাঁরা লড়াই করেছিলেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই গোল উৎসর্গ করেছেন তিনি।
আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকারের কথায়, দেশের জন্য সেই সৈনিকদের আত্মত্যাগের কারণেই আজকের প্রজন্ম তাঁদের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করতে পারে। তাঁর মতে, জাতীয় দলের সাম্প্রতিক সাফল্য এবং সমর্থকদের ভালোবাসার নেপথ্যেও রয়েছে সেই লড়াইয়ের উত্তরাধিকার।
লাউতারো আরও বলেন, তাঁরা যে সম্মান, স্বীকৃতি ও প্রশংসা পাচ্ছেন, তার পেছনে রয়েছে দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম। কীভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়, সেই শিক্ষাও তাঁরা পূর্বসূরিদের কাছ থেকেই পেয়েছেন।
প্রকাশ্যে ফুটবল, ড্রেসিংরুমে বাড়তি আবেগ
ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি চেয়েছিলেন, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়াই যেন ফকল্যান্ডস যুদ্ধের রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ না হয়ে পড়ে। তাঁর লক্ষ্য ছিল ফুটবলের মধ্যেই ম্যাচটিকে সীমাবদ্ধ রাখা।
তবে লাউতারোর বক্তব্যে স্পষ্ট, দলের অভ্যন্তরে ম্যাচটি ঘিরে আলাদা আবেগ কাজ করছিল। তাঁর কথায়, ক্যামেরার সামনে ফুটবলকেই প্রাধান্য দিতে হয়েছিল খেলোয়াড়দের। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে তাঁদের কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব ছিল অন্যরকম।
লাউতারো জানান, ফকল্যান্ডস ইস্যু দলকে বাড়তি শক্তি ও ইতিবাচক উদ্দীপনা জুগিয়েছিল। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সেই মানসিক শক্তি বিশেষ ভূমিকা নেয় বলেও মনে করেন তিনি।
ফকল্যান্ডস নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ
আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৮২ সালে দ্বীপপুঞ্জ দখলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন সেনা ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। প্রাণ হারান দ্বীপের তিন বাসিন্দাও। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনী দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। তবে সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধের অবসান আজও হয়নি।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়ের পরও সেই ইতিহাসের ছাপ দেখা যায় আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের উদ্যাপনে। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও জিওভানি লো চেলসো গ্যালারির সামনে একটি ব্যানার তুলে ধরেন, যাতে লেখা ছিল, ‘লাস মালভিনাস সন আর্হেন্তিনাস’—অর্থাৎ, ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’।
ব্যানারটি কীভাবে সেখানে এল, তা স্পষ্ট না হলেও ঘটনাটি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের অভিযোগে বিষয়টি নিয়ে ফিফার তদন্তের কথাও উঠে আসে।
গোলের গুরুত্ব বুঝতে সময় লেগেছিল
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়সূচক গোলের তাৎপর্য প্রথম মুহূর্তে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন লাউতারো। টুর্নামেন্টের চাপ এবং পরবর্তী ফাইনালকে ঘিরে ব্যস্ততার মধ্যে গোলটির আবেগ যেন কিছুটা আড়ালেই ছিল।
তবে দেশে ফেরার পর সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া তাঁকে গোলটির প্রকৃত গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। লাউতারোর কথায়, আর্জেন্টিনার মানুষের সঙ্গে দেখা করার পরই তিনি উপলব্ধি করেন, এই গোল তাঁদের কাছে কতটা অর্থবহ। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ফাইনালের হার নিয়ে কী বললেন লাউতারো?
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ জয়ের পর ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা।
লাউতারোর মতে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল দলকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেকটাই ক্লান্ত করে দিয়েছিল। তবে ফাইনালে আর্জেন্টিনা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেয়নি, এমন অভিযোগ মানতে নারাজ তিনি।
তাঁর দাবি, ফাইনালেও দলের খেলোয়াড়েরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছেন। কয়েকজন খেলোয়াড় শারীরিকভাবে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তাঁদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবুও তাঁরা মাঠে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন।
প্রতিপক্ষের শক্তির কথাও স্বীকার করেছেন আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার। তাঁর মতে, ফাইনালের ফল নিয়ে নানা তত্ত্ব সামনে এলেও দলের খেলোয়াড়েরা জানেন, তাঁরা নিজেদের সাধ্যমতো সবকিছু করেছিলেন। সেই বিশ্বাসই তাঁদের মানসিক শান্তি দেয়।
সমর্থকদের সঙ্গে সংযোগই সাফল্যের চাবিকাঠি
পুরো বিশ্বকাপ অভিযান ফিরে দেখতে গিয়ে লাউতারো জানিয়েছেন, দলের সঙ্গে সমর্থকদের গভীর সংযোগই ছিল আর্জেন্টিনার অন্যতম শক্তি। তাঁর মতে, প্রতিটি ম্যাচ ছিল কঠিন এবং প্রতিটি পর্যায়ে দলকে কঠোর লড়াই করতে হয়েছে।
লাউতারোর কথায়, এই দল কখনও হাল ছাড়তে শেখেনি। বরং প্রতিটি ম্যাচে আরও ভালো করার তাগিদ নিয়ে মাঠে নেমেছে তারা। সেই মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে লিওনেল মেসির নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় তাই লাউতারোর কাছে শুধুমাত্র বিশ্বকাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল নয়। তাঁর কাছে এই ম্যাচ জড়িয়ে রয়েছে দেশের ইতিহাস, যুদ্ধের স্মৃতি, পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগ এবং আর্জেন্টিনার মানুষের আবেগের সঙ্গে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর