‘বাবা, আমি কাউকেই বাঁচাতে পারলাম না। আপনাদের মেয়েদেরও বাঁচাতে পারিনি, আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন।’ ফোনের ওপাশ থেকে জামাইয়ের এমন আর্তনাদ শুনে হতবাক হয়ে যান মো. মামুনুর রশিদ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেটে যায় ফোন। এর কিছুক্ষণ পরই জানতে পারেন, কক্সবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর দুই মেয়ে। যে মেয়েদের ঘিরে ছিল অসংখ্য স্বপ্ন, তাঁদের মরদেহ শনাক্ত করতেও এখন ডিএনএ পরীক্ষার আশ্রয় নিতে হচ্ছে শোকাহত এই বাবাকে।
রাজধানীর বনশ্রীতে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ছিল মামুনুর রশিদের সংসার। বড় মেয়ে ইশরাত জাহান মালিহার বিয়ে হয়েছে দুই বছর আগে। ছোট মেয়ে লায়লা জাহান নাবিলা ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই মেয়েকে হারিয়ে এখন শোকে দিশাহারা তিনি।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে মেয়েদের মরদেহ শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা দিতে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে যান মামুনুর রশিদ। সেখানে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মামুনুর রশিদ বলেন, ‘সকাল ৮টার দিকে বড় মেয়ের জামাই আশিকুর রহমান আশিক ফোন করে বলেন, বাবা, আমি কাউকেই আর বাঁচাতে পারলাম না। আমি জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? তখন সে বলে, আপনাদের মেয়েদের আমি আর বাঁচাতে পারলাম না, আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। এরপরই ফোন কেটে দেয়।’
তিনি জানান, কিছুক্ষণ পর জানতে পারেন, কক্সবাজারে তাঁর মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা যে রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন, সেখানে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। মেয়ের জামাই কোনোভাবে জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারলেও অন্যরা বের হতে পারেননি।
দুই মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই বাবা। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘আমার মেয়েরা আমার কাছে কত বড় সম্পদ ছিল, সেটা একমাত্র আমি জানি। আজ আমার মেয়ে দুটো আগুনে এমনভাবে পুড়ে লাশ হয়ে আছে যে তাদের আমরা শনাক্ত করতে পারছি না। তাদের লাশ শনাক্ত করতে আমাদের ডিএনএ টেস্ট করতে হচ্ছে। এ দিন দেখার আগে আমার কেন মৃত্যু হলো না!’
আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, ‘দুই ঘণ্টা পরই ওদের ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই আমার সব শেষ।’
ছোট মেয়ে লায়লা জাহান নাবিলাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের। পড়াশোনায় মেধাবী নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়ন করছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল তাঁর।
মামুনুর রশিদ জানান, মেয়ের শিক্ষকেরা নাবিলার ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন। কয়েক দিন আগেই একটি সম্মেলনে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স বিষয়ে প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন নাবিলা। তাঁর এই সাফল্যের কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান ও ডিনকেও জানানো হয়েছিল।

নাবিলাকে উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন শিক্ষকেরা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও পাঠানো হয়েছিল সেখানে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিল নাবিলার জীবন।
শুধু দুই মেয়েই নন, ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে পরিবারের আরও চার সদস্যকে হারিয়েছেন মামুনুর রশিদ। নিহতদের মধ্যে রয়েছে সাত বছর বয়সী শিশু ফাইজান নূরও।
একসঙ্গে পরিবারের ছয় সদস্যের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্বজনদের মধ্যে। তবে মামুনুর রশিদের সবচেয়ে বড় কষ্ট, আগুনে পুড়ে যাওয়া মেয়েদের মরদেহও তিনি শনাক্ত করতে পারছেন না।
মেয়েদের শেষবারের মতো দেখার সুযোগটুকুও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরিচয় নিশ্চিত করতে দিতে হচ্ছে ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা। শোকাহত এই বাবার দাবি, যত দ্রুত সম্ভব ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া শেষ করে তাঁর দুই মেয়েসহ নিহত সবার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।
ভয়াবহ এই প্রাণহানির জন্য রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মামুনুর রশিদ।
তিনি জানান, রবিবার সকাল ১০টায় রিসোর্ট ছেড়ে পরিবারের সদস্যদের ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার মাত্র দুই ঘণ্টা আগেই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
মামুনুর রশিদ বলেন, যতটুকু জানতে পেরেছেন, রিসোর্টে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ ছিল একই জায়গায়। সেখানেই ক্যানটিন ও রান্নার ব্যবস্থাও ছিল।
তাঁর মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার জন্য বিকল্প পথ থাকলে হয়তো এত মানুষের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো।
তিনি আরও জানান, রিসোর্টের বিভিন্ন স্থাপনা কাঠের তৈরি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ভেতরে আটকা পড়া ব্যক্তিরা বের হওয়ার সুযোগ পাননি।
এদিকে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ফিরোজ কবির রোববার সকালে গণমাধ্যমকে জানান, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের কারও পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল ছাড়া মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সবার পরিচয় শনাক্ত করতে কিছুটা সময় লাগবে।
অন্যদিকে, সিআইডি কার্যালয়ে ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা দিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনহারা মামুনুর রশিদ। তাঁর এখন একটাই চাওয়া—দ্রুত মেয়েদের মরদেহ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক, যেন অন্তত শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতাটুকু সম্পন্ন করতে পারেন।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর