• ঢাকা
  • ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
ওবায়দুল হক চৌধুরী
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:২০ বিকাল

১০ পর্যটকের মৃত্যু: মামলায় মালিক বাদ, এজাহারে অসংগতি; রিসোর্ট বন্ধে পদক্ষেপ কোথায়?

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রিসোর্টের দুই মালিকের একজনকে আসামি করা হলেও অন্যজনের নাম নেই। এজাহারে ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া সতর্কবার্তার তথ্য উল্লেখ না করা এবং মামলার ধারার প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক), পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, রিসোর্টটির বিরুদ্ধে আগে নোটিশ, ক্ষতিপূরণ ধার্য ও অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে চালু ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আগুনের কারণ, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে মেরিন ড্রাইভের পাশে পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয় এবং দগ্ধ হন আরও ছয়জন। জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান। অন্য সদস্যরা হলেন উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার, উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান এবং ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধি।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তাসনীম জাহান বলেন, আগুন লাগার কারণ, পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও নথিপত্র এবং অবকাঠামোগত সমস্যা খতিয়ে দেখা হয়েছে। বিস্তারিত তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, রোববার (১৮ অক্টোবর) থেকে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিটিকে পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তবে প্রয়োজনে আরও সময় লাগতে পারে।

মালিক দুইজন, আসামী একজন : ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টটি যৌথভাবে গড়ে তোলেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদণ্ডী গ্রামের মো. তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত নয়টার দিকে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এজাহারে চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়া (৩৮), প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহাম্মেদ (৩২), ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ (৩০) এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন (২৯)। বাকি ১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে রিসোর্টের অন্যতম মালিক নিয়াজ মোর্শেদের নাম না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের আগের সতর্কবার্তার তথ্য উল্লেখ না করায় মামলার তদন্ত ও ধারার প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা করেছেন আইনজীবীরা।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য বলেন, ঘটনার দিনই পুলিশকে জানানো হয়েছিল, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এজাহারে বিষয়টি উল্লেখ না করার কারণ পুলিশই বলতে পারবে।

মামলার বাদী এসআই আশিস সূত্রধর বলেন, তিনি পূজার ছুটিতে আছেন। ২৭ বা ২৮ অক্টোবর ফিরলে এ বিষয়ে কথা বলা যাবে।

উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, মামলা করার সময় পুলিশ নিয়াজ মোর্শেদের নাম জানত না। এ কারণে আপাতত তানভীরকে আসামি করা হয়েছে। নিয়াজকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এজাহারে কোনো ভুল বা অসংগতি থাকলে অভিযোগপত্রে তা সংযোজন করা হবে।

কক্সবাজার আদালতের আইনজীবী ইউসুফ আরমান বলেন, যৌথ মালিকানার রিসোর্টে একজন মালিককে আসামি করে অন্যজনকে বাদ দেওয়া রহস্যজনক। কর্মচারীদের অজ্ঞাতনামা আসামি করাও আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেন তিনি। ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তার তথ্য এজাহারে না থাকায় মামলাটি দুর্বল হয়েছে বলেও তাঁর মত।

ইউসুফ আরমানের ভাষ্য, মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় করা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর। তাঁর দাবি, ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তার কথা এজাহারে উল্লেখ করা হলে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন এবং সর্বনিম্ন ১০ বছর হতে পারত।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্টটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দুর্ঘটনার পর একজন মালিককে বাদ দেওয়া এবং ফায়ার সার্ভিসের তথ্য যথাযথভাবে কাজে না লাগানোও দায়িত্বহীনতার পরিচয়।

মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত করা যাচ্ছে না : পুলিশ, হাসপাতাল ও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তগীন মাহমুদ বলেন, নিহতদের পরিচয় জানা গেলেও কোন মরদেহটি কার, তা এখনই শনাক্ত করা সম্ভব নয়। আগুনে মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।

অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জন হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। তাঁদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য উড়োজাহাজে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বাকি দুজন কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে স্বেচ্ছায় ছাড়পত্র নিয়ে ঢাকায় ফিরে গেছেন।

১১ জন নিখোঁজের দাবি, উদ্ধার ১০ মরদেহ : রিসোর্টে থাকা ১১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্বজনেরা দাবি করলেও ঘটনার দিন ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিন দিন পরও অপর ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ১০টি মরদেহ উদ্ধারের পর শনিবার বিকেল চারটায় ফায়ার সার্ভিস অভিযান শেষ করে। পরে একজন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়ায় রোববার বিকেলেও পোড়া রিসোর্টে তল্লাশি চালানো হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশাসন ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ আনোয়ার বলেন, দুর্ঘটনাস্থল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভালোভাবে তল্লাশি চালানোর আগেই তাঁদের সেখান থেকে সরে আসতে হয়।

এদিকে, নিহতদের পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে না। ১০টি মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের হিমাগারে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের আরএমও ডা. সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, রোববার বিকেলে মরদেহ থেকে ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ময়নাতদন্ত না করার আবেদনও করা হয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, পাঁচটি মরদেহের ময়নাতদন্ত না করার আবেদন পাওয়া গেছে। আরও কিছু আবেদন কুরিয়ারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ডিএনএ প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত কোনো মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। মানবিক বিবেচনায় প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে না।

ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, এটি সরাসরি হত্যা মামলা নয়। তাই ময়নাতদন্ত না হলে এ মামলায় বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হবে না।

সুমনের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন, হয়নি শুনানি : মামলার চার নম্বর আসামি রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রোববার আদালতে পাঠায় পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিএনএর নমুনা নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করায় সেদিন রিমান্ড শুনানি হয়নি।

কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহাজাহাল এলাহী নূরী বলেন, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মুহাম্মদ আসিফের আদালতে সুমনকে হাজির করা হয়। রিমান্ড শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় শুনানি না করে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা সশরীরে উপস্থিত হয়ে আবেদন করলে রিমান্ড শুনানি হবে।

কক্সবাজার পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তার দায় কার?*: একটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নোটিশ দিয়েছিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। পরিবেশ অধিদপ্তরও বলেছিল, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় স্থাপনাটি নির্মাণের কারণে সেখানে ছাড়পত্র দেওয়ার সুযোগ নেই। অগ্নিনিরাপত্তাবিষয়ক অনুমোদন না থাকার কথা বলছে ফায়ার সার্ভিস।

তারপরও কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে পর্যটকেরা উঠেছেন, রাত কাটিয়েছেন। আগুন লাগার পর সেখান থেকে উদ্ধার হয়েছে ১০টি দেহাবশেষ। স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।

তবে নিখোঁজ ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা এবং উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় নিয়ে নিশ্চিত তথ্য এখনো মেলেনি।

এখন প্রশ্ন উঠছে, এতগুলো সরকারি দপ্তরের নজরদারি, নোটিশ ও আইন প্রয়োগের উদ্যোগের পরও রিসোর্টটি কীভাবে চালু ছিল?

আগুন লাগার পর মানুষকে নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা ছিল কি? আর কোনো দপ্তরের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না?

সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যা জানা গেল : রিসোর্টটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ একেবারে ছিল না, এমন নয়। বরং একাধিক দপ্তর বলছে, তারা ব্যবস্থা নিতে চেয়েছে, নোটিশ দিয়েছে, অনুমোদনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে কিংবা লাইসেন্স নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়নি।

অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বারবার এসেছে জনবলসংকটের কথা। তাঁদের দাবি, একটি জেলার শত শত বা হাজারো প্রতিষ্ঠান তদারক করার মতো লোকবল তাঁদের নেই।

তাহলে কি পর্যটন এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের সচেতনতার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল?

নোটিশ ও নির্দেশের পরও চালু ছিল রিসোর্ট*: জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, রিসোর্টটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছিল না। ভবন নির্মাণের জন্য কউকের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়নি বলে তিনি জানান। ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন বলেন, রিসোর্ট নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং সেখানে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থাও ছিল না। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও ছিল না।

কউকের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি বলেন, ২০২৩ সাল থেকে টুপটুপ রিসোর্টকে পর্যায়ক্রমে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কাজ বন্ধ করা ও স্থাপনাটি অপসারণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। রিসোর্টটির অনুমোদনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়, কারণ এটি ‘নো-ডেভেলপমেন্ট জোনে’ অবস্থিত বলে তিনি জানান।

ফজলে রাব্বির ভাষ্য, মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকায় ডিজিটাল জরিপের মাধ্যমে স্থাপনা শনাক্ত করা হচ্ছে। প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০টি স্থাপনা চিহ্নিত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আওতায় আনা হয়েছে। তবে নোটিশ দেওয়ার পরও অনেক প্রতিষ্ঠান আইন মানে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছর টুপটুপ রিসোর্টকে নোটিশ দেওয়ার পর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৭ ধারার ক্ষমতাবলে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়।

মাহমুদ পাশা জানান, গত এক বছরে মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁসহ প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ৩০টি নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় না, কতটি স্থাপনা বন্ধ বা অপসারণ করা হয়েছে কিংবা কতটি প্রতিষ্ঠান জরিমানা দেওয়ার পরও কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। তাঁর মতে, নোটিশ দেওয়া বা মামলা করাই নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার প্রমাণ নয়।

একজন ইন্সপেক্টরের দায়িত্বে ৫০০–৬০০ প্রতিষ্ঠান*: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, পুরো কক্সবাজার জেলায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র একজন অনুমোদিত ইন্সপেক্টর। তাঁর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান ই-ফায়ার লাইসেন্স নিয়েছে এবং আরও প্রায় ৫২টি আবেদন করেছে বলে জানান তিনি।

আজাদ আনোয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত জুনে ফায়ার সার্ভিসের ইন্সপেক্টর টুপটুপ রিসোর্টকে লিখিত নোটিশ দিয়ে ই-ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের দিন এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদও জানান, জুনে পরিদর্শনের পর রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সতর্ক করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।

আজাদ আনোয়ার বলেন, একজন ইন্সপেক্টরের পক্ষে প্রতিদিন একটি করে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করলেও ৫০০ থেকে ৬০০টি প্রতিষ্ঠান আবার পরিদর্শন করতে এক থেকে দেড় বছর সময় লাগতে পারে। পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রতিবেদন তৈরি, শুনানি ও অন্যান্য দায়িত্বও পালন করতে হয়। এ কারণে নিয়মিত সব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই করা সম্ভব হয় না বলে জানান তিনি।

তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার পর সেটি লাইসেন্স না নেওয়া পর্যন্ত ব্যবসা চালানো ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

জনবলসংকট, নাকি সমন্বয়ের ঘাটতি? : সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বক্তব্যে জনবলসংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক আজাদ আনোয়ার বলেন, তাঁদের নিজস্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেই। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিতে হয়। ই-ফায়ার লাইসেন্স চালুর পর নোটিশের অনুলিপি স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহমুদ পাশা বলেন, কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার জন্য জেলা কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন মাত্র আটজন। তাঁদের মধ্যে সহকারী পরিচালক দুজন। পরিবেশগত আইন প্রয়োগ, মামলা পরিচালনা ও অন্যান্য দায়িত্ব তাঁদের সামলাতে হয়।

অন্যদিকে, কউক বলছে, তারা নোটিশ দিয়েছে এবং অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে; পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, ক্ষতিপূরণ ধার্য ও মামলা করেছে; আর ফায়ার সার্ভিস বলছে, অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালিত হচ্ছিল। এত পদক্ষেপের পরও স্থাপনাটি চালু থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সমন্বয়হীনতার অভিযোগ নাকচ করে আজাদ আনোয়ার বলেন, বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। তবে জনবল ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নজরদারি করা কঠিন।

আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, জনবলসংকট বাস্তব সমস্যা হতে পারে। কিন্তু কোনো স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করার পর ঝুঁকি কমানো বা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করার বিকল্প ব্যবস্থা কী ছিল, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, নোটিশ দেওয়া ও মামলা করার হিসাবই নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার প্রমাণ নয়।

কাঠের স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার প্রশ্ন: মেরিন ড্রাইভের পূর্ব পাশে ২০ শতক জমির ওপর রিসোর্টটির তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। ভবনের চারপাশের দেয়াল ইট-পাথরের হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় তলার মেঝে ছিল কাঠের পাটাতনের। সিঁড়িতে লোহার ফ্রেমের ওপর কাঠের তক্তা বসানো ছিল। ছাদ ছিল টিনের। পশ্চিম পাশে গাছের খুঁটির ওপর কাঠের বর্ধিত অংশে রেস্তোরাঁ পরিচালিত হতো। তিন বছর আগে স্থানীয় এক নারীর কাছ থেকে জমি কিনে রিসোর্টটি নির্মাণ করা হয়।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক আজাদ আনোয়ার বলেন, কাঠ বা বাঁশ দিয়ে তৈরি স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্থাপনার ধরন ও নকশা অনুযায়ী স্প্রিঙ্কলার, রাইজার, পাইপলাইন, ফায়ার পাম্প এবং পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা অবকাঠামো থাকতে পারে।

কউকের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বিও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের স্থাপনায় অগ্নিপ্রতিরোধী কাঠামো ও প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকা দরকার।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রিসোর্টের রান্নাঘর ও সিঁড়ি কাছাকাছি ছিল। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটকদের বের হওয়ার পথে বাধা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ, স্থাপনার নকশা, বিকল্প বহির্গমনপথ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি : টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে গঠিত তদন্ত কমিটির সামনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কউকের নোটিশ ও অপসারণের নির্দেশের পরও রিসোর্টটি কীভাবে চালু ছিল? পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ ও ক্ষতিপূরণ ধার্যের পর স্থাপনাটির কার্যক্রম বন্ধ বা অপসারণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তার পর অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছিল কি না? আর বিভিন্ন দপ্তরের কাছে অনুমোদন ও নিরাপত্তার ঘাটতির তথ্য থাকার পরও সমন্বিতভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না?

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, জনবল সীমিত থাকলেও কোনো স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ বলে শনাক্ত হওয়ার পর সেই ঝুঁকি কমানোর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজনে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনকে কাজে লাগানো যেত। তাঁর মতে, অগ্নিকাণ্ডের আগে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং নোটিশ ও নির্দেশ কার্যকর করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট না হলে প্রশাসনিক দায়ের প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর পাওয়া যাবে না।

সালাউদ্দিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]