সমুদ্রের হাজার মিটার গভীরে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। চারদিকে ঘন অন্ধকার, প্রচণ্ড পানির চাপ আর অজানা বিপদের আশঙ্কা। অথচ সেই অন্ধকারেই হঠাৎ জ্বলে ওঠে নীল, সবুজ কিংবা লাল আলো। কখনো ছোট ছোট আলোকবিন্দু ছুটে বেড়ায়, কখনো জেলিফিশের শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়ে রহস্যময় আভা। আবার কোনো মাছ নিজের মাথার সামনে আলো জ্বালিয়ে শিকারের অপেক্ষায় থাকে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এসব কোনো কল্পবিজ্ঞানের দৃশ্য নয়। পৃথিবীর গভীর সমুদ্রে সত্যিই রয়েছে এমন অসংখ্য প্রাণী, যারা নিজের শরীরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিস্ময়কর ঘটনাকে বলা হয় ‘বায়োলুমিনেসেন্স’ (Bioluminescence)।
পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় অঞ্চলগুলোর একটি গভীর সমুদ্র। মহাকাশে মানুষ দূরবীক্ষণ যন্ত্র পাঠিয়েছে, চাঁদে পা রেখেছে, এমনকি মঙ্গল গ্রহেও অনুসন্ধান চালাচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর সমুদ্রের বিশাল অংশ সম্পর্কে এখনও আমাদের জ্ঞান সীমিত।
সমুদ্রের গভীরে এমন এক জগৎ রয়েছে, যেখানে আলো শুধু দেখার মাধ্যম নয়; কখনো তা শিকারের ফাঁদ, কখনো আত্মরক্ষার অস্ত্র, আবার কখনো সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার সংকেত।
প্রশ্ন হলো, সূর্যের আলো ছাড়া প্রাণীরা নিজের শরীরে আলো তৈরি করে কীভাবে? আর সমুদ্রের অন্ধকারে এই আলোর প্রয়োজনই বা কেন?

সমুদ্রের উপরিভাগে সূর্যের আলো থাকলেও গভীরে নামার সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে থাকে। সাধারণভাবে সমুদ্রের ওপরের প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত অঞ্চলকে আলোকিত স্তর বা Sunlight Zone বলা হয়। তবে আলো কত গভীর পর্যন্ত পৌঁছাবে, তা পানির স্বচ্ছতা ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। প্রায় ২০০ থেকে ১ হাজার মিটার গভীর অঞ্চলকে বলা হয় Twilight Zone বা গোধূলি অঞ্চল। এখানে সূর্যের আলো অত্যন্ত ক্ষীণ।
এর নিচে শুরু হয় এমন এক অন্ধকার জগৎ, যেখানে সূর্যের কার্যকর আলো পৌঁছায় না। কিন্তু অন্ধকার মানেই সেখানে আলো নেই—এমন নয়। কারণ সমুদ্রের অসংখ্য প্রাণী নিজেরাই আলোর উৎস।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) জানিয়েছে, সমুদ্রের মধ্যবর্তী গভীরতায় বসবাসকারী প্রাণীদের মধ্যে বায়োলুমিনেসেন্স অত্যন্ত সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য।
অর্থাৎ, গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা আলো কোনো বিরল কল্পকাহিনি নয়; এটি সেখানকার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মানুষের আলো জ্বালাতে প্রয়োজন হয় বিদ্যুৎ, আগুন কিংবা অন্য কোনো শক্তির উৎস। কিন্তু সমুদ্রের অনেক প্রাণী নিজেদের শরীরের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করেই আলো তৈরি করতে পারে।
এই প্রক্রিয়ার নাম বায়োলুমিনেসেন্স (Bioluminescence)। বাংলায় একে বলা যায় জীবদীপ্তি। সাধারণভাবে এ প্রক্রিয়ায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কাজ করে। একটি লুসিফেরিন (Luciferin), অন্যটি লুসিফেরেজ (Luciferase)। লুসিফেরিন হলো আলো তৈরির রাসায়নিক উপাদান। আর লুসিফেরেজ হলো এক ধরনের এনজাইম, যা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
অক্সিজেনের উপস্থিতিতে নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন হয় এবং সেই শক্তির একটি অংশ আলো হিসেবে বেরিয়ে আসে। তবে সব জীবদীপ্ত প্রাণী একই রাসায়নিক উপাদান বা এনজাইম ব্যবহার করে না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই আলো তৈরির সময় সাধারণ বৈদ্যুতিক বাতির মতো বিপুল তাপ উৎপন্ন হয় না। তাই একে অনেক সময় শীতল আলো বা Cold Light বলা হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের NOAA Ocean Exploration-এর তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রের ২০০ থেকে ১ হাজার মিটার গভীরতায় উন্মুক্ত পানিতে বসবাসকারী প্রাণীদের প্রায় ৮০ শতাংশের মধ্যে জীবদীপ্তির ক্ষমতা পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সমুদ্রের এই নির্দিষ্ট অঞ্চলে আলো তৈরি করতে পারা প্রাণীর সংখ্যা আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। তবে এর অর্থ এই নয় যে সমুদ্রের সব গভীরতায় বা সব ধরনের সামুদ্রিক প্রাণীর ৮০ শতাংশ আলো তৈরি করতে পারে। অঞ্চল ও প্রাণীগোষ্ঠীভেদে এই হার ভিন্ন।

জেলিফিশ, স্কুইড, চিংড়ি, মাছ, সামুদ্রিক কৃমি এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র প্ল্যাঙ্কটনের মধ্যে জীবদীপ্তির বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
গভীর সমুদ্রের সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণীগুলোর একটি হলো অ্যাংলারফিশ (Anglerfish)। এই মাছের চেহারা দেখলে অনেকের কাছে সেটিকে ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হতে পারে। বড় মুখ, ধারালো দাঁত এবং মাথার সামনে ঝুলে থাকা এক অদ্ভুত অঙ্গ—সব মিলিয়ে এটি গভীর সমুদ্রের এক ভয়ংকর শিকারি। কিছু প্রজাতির স্ত্রী অ্যাংলারফিশের মাথা থেকে বেরিয়ে আসে মাছ ধরার ছিপের মতো একটি অঙ্গ। এর শেষ প্রান্তে থাকে আলো জ্বলা অংশ। অন্ধকার সমুদ্রে ছোট মাছ কিংবা অন্য শিকার এই আলো দেখে কাছে চলে আসে। আর তখনই সুযোগ বুঝে শিকার ধরে ফেলে অ্যাংলারফিশ। এখানে আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য রয়েছে।
কিছু গভীর সমুদ্রের অ্যাংলারফিশ নিজেরা সরাসরি আলো তৈরি না করে শরীরে বসবাসকারী বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার সাহায্য নেয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো আলো উৎপন্ন করে। অর্থাৎ, মাছটি শিকারের ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে অন্য এক জীবের তৈরি আলো।
সমুদ্রের অন্ধকারে জেলিফিশের আলোকচ্ছটা এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করতে পারে। কিছু জেলিফিশ বিপদের সময় শরীর থেকে উজ্জ্বল আলোর ঝলক সৃষ্টি করে। এর মধ্যে বিশেষভাবে পরিচিত অ্যাটোলা জেলিফিশ (Atolla jellyfish)। এই জেলিফিশ বিপদের মুখে পড়লে বৃত্তাকার আলোর ঝলক তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই আচরণকে অনেক সময় Burglar Alarm বা চোর ধরার সতর্কসংকেতের সঙ্গে তুলনা করেন।

ধারণা করা হয়, কোনো শিকারি যখন জেলিফিশকে আক্রমণ করে, তখন জেলিফিশের আলোকসংকেত আশপাশের বড় শিকারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। ফলে আক্রমণকারী নিজেই বিপদে পড়তে পারে। অর্থাৎ, আলো এখানে শুধু সৌন্দর্য নয়; জীবন বাঁচানোর একটি সম্ভাব্য কৌশল।
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সমুদ্রের কিছু প্রাণী আলো তৈরি করে নিজেদের অদৃশ্য করার জন্য। সাধারণভাবে আমরা মনে করি, আলো জ্বালালে কোনো প্রাণী সহজেই চোখে পড়বে। কিন্তু সমুদ্রের গোধূলি অঞ্চলে কখনো উল্টো ঘটনাও ঘটে। উপর থেকে সামান্য আলো পানির ভেতরে প্রবেশ করলে নিচে থাকা শিকারি ওপরের দিকে তাকিয়ে কোনো মাছের কালো ছায়া দেখতে পারে। কিছু মাছ তখন নিজেদের পেটের নিচের বিশেষ অঙ্গ থেকে আলো তৈরি করে। এই আলো ওপর থেকে আসা ক্ষীণ আলোর সঙ্গে মিশে যায়। ফলে নিচ থেকে তাকালে মাছটির ছায়া অনেক কম দৃশ্যমান হয়।
এই কৌশলকে বলা হয় কাউন্টারইলুমিনেশন (Counterillumination)। হ্যাচেটফিশসহ কয়েক ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী এভাবে নিজেদের আড়াল করতে পারে।

বেশির ভাগ সামুদ্রিক জীবদীপ্ত প্রাণী নীল কিংবা সবুজাভ আলো তৈরি করে। কারণ সমুদ্রের পানিতে নীল ও সবুজ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তুলনামূলক বেশি দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে লাল আলো পানিতে দ্রুত শোষিত হয়। তাই গভীর সমুদ্রে লাল আলো অত্যন্ত বিরল। কিন্তু কিছু ড্রাগনফিশ (Dragonfish) এই সীমাবদ্ধতাকেই শিকারের সুবিধায় পরিণত করেছে। বিশেষ করে লুজজ ড্রাগনফিশের কিছু প্রজাতি লাল আলো তৈরি করতে পারে।
এই আলো ব্যবহার করে তারা এমন শিকার শনাক্ত করতে পারে, যাদের অনেকেই লাল আলো ভালোভাবে দেখতে পারে না। ফলে শিকার বুঝতেই পারে না যে তাকে আলোকিত করে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এটি যেন গভীর সমুদ্রের এক বিশেষ ধরনের গোপন সার্চলাইট।
পৃথিবীর গভীর সমুদ্র এমন এক জগৎ, যেখানে মানুষের পরিচিত পরিবেশের অনেক নিয়মই যেন নতুন অর্থ পায়। সেখানে সূর্যের আলো নেই, কিন্তু আলো তৈরি করার ক্ষমতা রয়েছে অসংখ্য প্রাণীর। কেউ সেই আলো দিয়ে খাবার খুঁজে পায়, কেউ শত্রুকে বিভ্রান্ত করে, আবার কেউ নিজের অস্তিত্বই আড়াল করে ফেলে। যে আলো আমাদের চোখে অপূর্ব সৌন্দর্যের দৃশ্য, গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের কাছে সেটিই হতে পারে জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রকৃতি কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ধারায় এমন সব কৌশল তৈরি করেছে, যা আজও বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
সমুদ্রের গভীর অন্ধকার তাই আসলে পুরোপুরি আলোহীন নয়। সেখানে আলো জ্বলে—কখনো শিকারের আশায়, কখনো আত্মরক্ষায়, কখনো জীবনের আরেকটি সুযোগ খুঁজে পাওয়ার জন্য। আর সেই জীবন্ত আলোর প্রতিটি ঝলক যেন মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে অন্ধকার জায়গাতেও প্রকৃতি তার বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ভিন্ন স্বাদের খবর এর সর্বশেষ খবর