ঢাকনা খুলতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র দুর্গন্ধ। কারও কাছে মনে হয় পচা ডিমের গন্ধ, কারও কাছে নর্দমার। কেউ নাক চেপে ধরেন, কেউ আবার খাবারটি মুখে দেওয়ার আগেই পিছিয়ে যান। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই খাবার খাওয়ার জন্যই সুইডেনে আয়োজন করা হয় বিশেষ উৎসব! শত শত বছর ধরে দেশটির খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে এমন এক মাছ, যার নাম ‘সুরস্ট্রোমিং’ (Surströmming)।
বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত খাবারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত সুইডেনের এই বিশেষ মাছ। এর গন্ধ এতটাই তীব্র যে সাধারণত ঘরের ভেতরে নয়, খোলা জায়গায় এটি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে খাবারের গন্ধ অনেকেই সহ্য করতে পারেন না, সেটিই আবার অন্যদের কাছে এত প্রিয় কেন? এর স্বাদে কী এমন আছে? আর কীভাবেই বা তৈরি হয় এই অদ্ভুত খাবার?
সুরস্ট্রোমিং হলো সুইডেনের ঐতিহ্যবাহী এক ধরনের গাঁজন করা মাছ। এটি তৈরি হয় মূলত বাল্টিক সাগরের ছোট হেরিং মাছ দিয়ে।
সুইডিশ ভাষায় ‘Sur’ অর্থ টক এবং ‘Strömming’ বলতে বাল্টিক অঞ্চলের হেরিং মাছকে বোঝায়। অর্থাৎ নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে খাবারটির পরিচয়—টক বা গাঁজন করা হেরিং মাছ।
সুরস্ট্রোমিংয়ের সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো এর গন্ধ। সাধারণ মাছ নষ্ট হয়ে গেলে যে ধরনের দুর্গন্ধ তৈরি হয়, সুরস্ট্রোমিংয়ের গন্ধ অনেকের কাছে তার চেয়েও বেশি তীব্র মনে হতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুরস্ট্রোমিং সাধারণ অর্থে পচে যাওয়া মাছ নয়। এটি নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় গাঁজন করা মাছ।
গাঁজনের সময় মাছের উপাদান ব্যাকটেরিয়া ও এনজাইমের প্রভাবে ভাঙতে থাকে। এতে বিভিন্ন জৈব অ্যাসিড ও তীব্র গন্ধযুক্ত যৌগ তৈরি হয়। এসব উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবেই তৈরি হয় খাবারটির বিশেষ গন্ধ।
সুইডেনের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মাছ গাঁজন করার প্রক্রিয়ায় অণুজীব ও মাছের নিজস্ব এনজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ, যে গন্ধে অনেকের বমি বমি ভাব হতে পারে, সেটিই আবার সুরস্ট্রোমিংয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

কীভাবে তৈরি হয় এই অদ্ভুত মাছ?
সুরস্ট্রোমিং তৈরির পদ্ধতিও বেশ চমকপ্রদ। প্রথমে বসন্তকালে বাল্টিক সাগর থেকে ছোট হেরিং মাছ ধরা হয়। এরপর মাছ পরিষ্কার করে প্রায় দুই দিন বেশি লবণযুক্ত পানিতে রাখা হয়। পরবর্তী ধাপে মাছগুলো অপেক্ষাকৃত কম লবণযুক্ত পানিতে বড় পাত্র বা ব্যারেলে রাখা হয়। সেখানে প্রায় ছয় থেকে আট সপ্তাহ ধরে গাঁজন প্রক্রিয়া চলে। এরপর মাছগুলো টিনের কৌটায় ভরা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, কৌটায় ভরার পরও মাছের গাঁজন পুরোপুরি বন্ধ হয় না।
এই প্রক্রিয়ায় গ্যাস তৈরি হওয়ায় কখনো কখনো কৌটা কিছুটা ফুলে উঠতে পারে।
সাধারণ মাছের কৌটা খুলতে বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সুরস্ট্রোমিংয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কারণ গাঁজনের ফলে কৌটার ভেতরে চাপ তৈরি হতে পারে। তাই অসতর্কভাবে খুললে মাছের তরল ছিটকে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য সুইডেনে অনেকেই পানিভর্তি পাত্রের মধ্যে কৌটা খুলে থাকেন। এতে তরল ছিটকে পড়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তীব্র গন্ধের কারণে সাধারণত খোলা জায়গায় কৌটা খোলা ও খাবারটি পরিবেশন করা হয়।

এত দুর্গন্ধের পরও মানুষ কেন খেতে ভালোবাসে?
এটাই সুরস্ট্রোমিংয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রহস্য। গন্ধ এবং স্বাদ সব সময় এক রকম অনুভূতি তৈরি করে না। যাঁরা সুরস্ট্রোমিং পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে এর স্বাদ নোনতা, টক এবং গভীর উমামি স্বাদের এক বিশেষ সমন্বয়। উমামি হলো খাবারের একটি স্বাদগত বৈশিষ্ট্য, যা সাধারণত মাংস, মাছ, মাশরুম ও বিভিন্ন গাঁজন করা খাবারে অনুভূত হয়। সুরস্ট্রোমিং সাধারণত একা খাওয়া হয় না। এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয় পাতলা রুটি, সেদ্ধ আলু, পেঁয়াজ এবং কখনো টক ক্রিম। এসব উপাদান মাছের তীব্র স্বাদের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করে।
সুইডেনের জাতীয় বেতারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুরস্ট্রোমিং অ্যাকাডেমির সাবেক সভাপতি বু ডাহলিন ব্যাখ্যা করেছিলেন, খাবারটির গন্ধ এবং স্বাদকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত। তাঁর মতে, কিছু খাবারের স্বাদ উপভোগ করতে অভ্যস্ত হতে হয়। তাই একজনের কাছে যা অসহ্য দুর্গন্ধযুক্ত মাছ, অন্যজনের কাছে সেটিই হতে পারে অসাধারণ সুস্বাদু খাবার।

একসময় ছিল গরিবের খাবার, এখন উৎসবের আয়োজন
সুরস্ট্রোমিংয়ের ইতিহাস কয়েক শ বছরের পুরোনো। সুইডেনে অন্তত ষোড়শ শতক থেকে গাঁজন করা মাছ সংরক্ষণ ও বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। সে সময় লবণ ছিল তুলনামূলক দামি। মাছ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য প্রচুর লবণ ব্যবহার করা অনেকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে কম লবণ ব্যবহার করে মাছ গাঁজনের পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রথমদিকে এটি ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাবার। বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের খাদ্যসংস্কৃতিতে এর স্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে মাছ সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি হলেও সুরস্ট্রোমিং হারিয়ে যায়নি। বরং ধীরে ধীরে এটি উৎসবের খাবারে পরিণত হয়।
সুইডেনের Institute for Language and Folklore জানিয়েছে, একসময়কার স্বল্প খরচের সাধারণ খাবারটি এখন দেশটির বিশেষ ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়।

দুর্গন্ধযুক্ত মাছ খাওয়ার জন্য আলাদা উৎসব!
সুরস্ট্রোমিংয়ের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এর বিশেষ উৎসব। সুইডেনে প্রতিবছর আগস্ট মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী ‘সুরস্ট্রোমিং প্রিমিয়ার’ (Surströmmingspremiär)। ১৯৪০ সাল থেকে এই নির্দিষ্ট দিনে মৌসুমের সুরস্ট্রোমিং বাজারে আনার প্রথা চালু রয়েছে। এই উপলক্ষে অনেক পরিবার ও বন্ধুবান্ধব একত্র হয়ে বিশেষ খাবারের আয়োজন করেন। কোথাও কোথাও আয়োজন করা হয় বড় উৎসব।
সুইডেনে এ ধরনের সামাজিক খাবারের আয়োজনকে বলা হয় ‘সুরস্ট্রোমিংস্কিভা’ (Surströmmingsskiva)।
এখানে খাবারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের মিলনমেলা, গল্প, আড্ডা এবং পুরোনো ঐতিহ্যকে ধরে রাখা।
অর্থাৎ, সুরস্ট্রোমিং শুধু একটি খাবার নয়; এটি সুইডেনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ।
সত্যিই কি এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার?
সুরস্ট্রোমিংকে প্রায়ই পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার বলা হয়। তবে এই দাবির একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পৃথিবীর সব খাবারের গন্ধ পরিমাপ করে সুরস্ট্রোমিংকে আনুষ্ঠানিকভাবে এক নম্বরে রাখার সর্বজনস্বীকৃত বৈজ্ঞানিক তালিকা নেই।
তাই একে নিশ্চিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার না বলে বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত খাবারগুলোর একটি বলা বেশি যথাযথ।
সুইডেনের সরকারি পর্যটন সংস্থাও খাবারটিকে অত্যন্ত তীব্র গন্ধযুক্ত ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে তুলে ধরেছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত তীব্র গন্ধযুক্ত মাছ খেলে শরীরের ক্ষতি হয় না? এখানে গাঁজন করা মাছ এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া মাছের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। সঠিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত, সংরক্ষিত ও পরিবেশিত সুরস্ট্রোমিং একটি প্রচলিত খাদ্যপণ্য। তবে যেকোনো গাঁজন করা মাছের মতো এর উৎপাদন ও সংরক্ষণে খাদ্যনিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন।

সুইডেনের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গাঁজন করা মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিরাপদ প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশনা দিয়েছে।
তাই বাড়িতে সাধারণ মাছ পচিয়ে সুরস্ট্রোমিং বানানোর চেষ্টা করা নিরাপদ নয়। আবার কৌটা অস্বাভাবিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা সংরক্ষণের নিয়ম মানা না হলে সেটিও খাওয়া উচিত নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুরস্ট্রোমিং নিয়ে অসংখ্য ভিডিও দেখা যায়। কোথাও মানুষ কৌটা খুলেই নাক চেপে ধরছেন, কোথাও কেউ খাবারটি মুখে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এসব ভিডিওর কারণে সুইডেনের এই ঐতিহ্যবাহী খাবার বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে সুইডিশদের কাছে বিষয়টি শুধু গন্ধ সহ্য করার প্রতিযোগিতা নয়। এটি তাঁদের ইতিহাস, খাদ্যসংস্কৃতি এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা অভ্যাসের অংশ। যে খাবার একসময় কম খরচে মাছ সংরক্ষণের প্রয়োজন থেকে তৈরি হয়েছিল, সেটিই এখন দেশের বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করছে।
পৃথিবীর খাবারের বৈচিত্র্য সত্যিই বিস্ময়কর। কোথাও মানুষ ঝাল খাবার পছন্দ করেন, কোথাও কাঁচা মাছ, আবার কোথাও গাঁজন করা খাবার বিশেষ জনপ্রিয়। কিন্তু সুইডেনের সুরস্ট্রোমিং যেন সবকিছুকে ছাড়িয়ে এক অদ্ভুত প্রশ্ন সামনে আনে—যে গন্ধে একজন মানুষ খাবারের কাছেই যেতে পারেন না, সেই একই খাবার অন্যজনের কাছে এত প্রিয় হয় কীভাবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে স্বাদের অভ্যাস, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের খাদ্যরুচির বৈচিত্র্যে।
সুরস্ট্রোমিং প্রমাণ করে, একটি খাবারের মূল্য শুধু তার গন্ধে নয়; কখনো কখনো তার পেছনে লুকিয়ে থাকে কয়েক শ বছরের ইতিহাস ও একটি জাতির ঐতিহ্য।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ভিন্ন স্বাদের খবর এর সর্বশেষ খবর