সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় নিহত বাংলাদেশি প্রবাসী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁর মরদেহ পৌঁছালে তা গ্রহণ করেন পরিবারের সদস্যরা। এ সময় স্বামীর মরদেহ নিতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী কহিনুর আক্তার কাকলী।
বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কহিনুর জানান, সৌদি আরবে যাওয়ার আগে থেকেই স্বামীকে নিয়ে অজানা এক ভয় কাজ করছিল তাঁর মনে। তিনি বলেন, ‘আমি কাঁদছিলাম। সে আমাকে বলেছিল, “কেঁদো না। এক-দেড় ঘণ্টা পর বাসায় গিয়ে তোমাকে ফোন দেব।” কিন্তু আমার খুব ভয় লাগছিল। সে যাওয়ার আগে থেকেই কেমন যেন লাগছিল, আগে কখনো এমন ভয় লাগেনি। সৌদি আরবে যুদ্ধ হচ্ছে, এই ভেবেই আমি তাকে যেতে দিতে চাইনি। কিন্তু ও জোর করেই চলে গেল।’
স্বামীর সঙ্গে কাটানো শেষ দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে কাকলী বলেন, এবার প্রায় এক মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন শাহেদ। এই সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা বাইরে ঘোরাঘুরি না করে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়েই সময় কাটাতেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাইরে ঘুরতেও যেতেন তিনি। সেই স্মৃতিগুলোই এখন বারবার মনে পড়ছে কাকলীর।
শাহেদ ও কাকলীর সংসারে দুই ছেলে—জিহাদ ও কাউসার। তাদের মধ্যে জিহাদের বয়স পাঁচ বছর, আর কাউসারের ১০ বছর। বাবার মরদেহ নিতে স্বজনদের সঙ্গে বিমানবন্দরে এসেছিল তারাও।
মাত্র ২৬ বছর বয়সী কাকলী জানান, ১৩ বছর বয়সে শাহেদের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দুজনের পছন্দের সম্পর্ক থেকেই সংসারজীবনের শুরু। এত অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে জীবন চালাবেন, তা ভেবে দিশেহারা তিনি।
সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা তুলে ধরে কাকলী বলেন, ‘ওদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি চাই, আমার সন্তানদের নিয়ে যেন সারাটা জীবন বেঁচে থাকতে পারি। আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী যেন আমার পাশে দাঁড়ান।’
জানা গেছে, শাহেদ সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন। দেশটিতে তাঁর বৈধ কাজের অনুমতিপত্র (ইকামা) ছিল। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ছুটি কাটিয়ে দেশে থেকে রিয়াদ হয়ে জেদ্দায় কর্মস্থলে ফিরছিলেন তিনি। এ সময় রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় প্রাণ হারান শাহেদ।
এর আগে আরও দুবার সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। তবে কাজের ব্যবস্থা করতে না পেরে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। প্রায় দুই বছর আগে আবার সৌদি আরবে গিয়ে প্রথমে শ্বশুরের কাছে থাকেন। পরে শ্বশুরের মাধ্যমে একটি কোম্পানিতে চালকের চাকরি পান। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স জমা দিয়ে ওই চাকরিতে যোগ দেন তিনি। পরে কর্মস্থল পরিবর্তন হওয়ায় জেদ্দায় চলে যান শাহেদ। তাঁর শ্বশুর থেকে যান দাম্মামে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর ছুটিতে দেশে এসেছিলেন শাহেদ। এক মাস তিন দিন পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে আবার সৌদি আরবে ফিরে যান। এরপর ১০ অক্টোবর হুতিদের হামলায় প্রাণ হারান বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের এই প্রবাসী।
শাহেদের মরদেহ দেশে পৌঁছালে তা গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পরে তিনি মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারকে আর্থিক সহায়তার চেক দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন প্রতিমন্ত্রী।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর