পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী, অথচ মানুষ ব্যস্ত নানা স্বপ্ন আর অর্জনের পেছনে। একদিন সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে অনন্ত জীবনের পথে। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুই মানুষের শেষ গন্তব্য নয়; বরং এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় পরকালের এক নতুন অধ্যায়।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে নিশ্চিত অথচ সবচেয়ে অনিশ্চিত ঘটনা মৃত্যু। নিশ্চিত এ কারণে যে, প্রত্যেক মানুষকেই একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। আর অনিশ্চিত এ কারণে যে, কখন, কোথায় কিংবা কীভাবে মৃত্যু আসবে, তা কারও জানা নেই।
জীবনের ব্যস্ততায় মানুষ অনেক সময় ভুলে যায় এই অনিবার্য পরিণতির কথা। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)
ইসলামি বিশ্বাসে মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটে না। দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পর শুরু হয় বরযখের জীবন। এরপর কিয়ামত, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং চূড়ান্ত প্রতিদানের পর্যায় আসবে।
কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষের জন্য কী অপেক্ষা করছে? কেন কেউ মৃত্যুর মুহূর্তে পৃথিবীতে ফিরে আসতে চাইবে? কবরের জীবনে কী ঘটবে? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায়।
মৃত্যুর মুহূর্তে ফিরে আসার আকুতি
মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হবে, তখন দুনিয়ায় কাটানো জীবনের হিসাব তার সামনে নতুনভাবে ধরা দিতে পারে। বিশেষ করে যারা জীবিত অবস্থায় সৎকাজের সুযোগ অবহেলা করেছে, তাদের মধ্যে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হবে।
পবিত্র কোরআনে এ দৃশ্য তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি যা ছেড়ে এসেছি, সেখানে সৎকাজ করতে পারি। কখনোই নয়! এটি তো কেবল তার মুখের কথা। আর তাদের সামনে রয়েছে বরযখ, পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।’ (সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত ৯৯-১০০)
এই আয়াত মানুষের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা। জীবিত অবস্থায় যে সময় ও সুযোগ পাওয়া যায়, মৃত্যুর পর তা আর ফিরে আসে না।
অর্থসম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পার্থিব সাফল্য—কোনোটিই মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না। তাই ইসলাম মানুষকে সময় থাকতে নিজের কাজের হিসাব নিতে এবং সৎপথে ফিরে আসার শিক্ষা দেয়।
বরযখ: মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মধ্যবর্তী জীবন
ইসলামি পরিভাষায় মৃত্যু থেকে কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান পর্যন্ত মধ্যবর্তী অবস্থাকে বলা হয় ‘বরযখ’।
এটি এমন এক জগৎ, যার প্রকৃত অবস্থা মানুষের সাধারণ অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বাইরে। কোরআন ও হাদিসে যতটুকু বর্ণনা এসেছে, মুসলমানরা তার ভিত্তিতেই বরযখের জীবন সম্পর্কে বিশ্বাস পোষণ করেন।
বরযখে মানুষের অবস্থা সম্পর্কে কোরআনে ফেরাউনের অনুসারীদের একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আগুন, তাদের সকাল-সন্ধ্যায় তার সামনে উপস্থিত করা হয়। আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন বলা হবে, ফেরাউনের অনুসারীদের কঠিনতম শাস্তিতে প্রবেশ করাও।’ (সুরা গাফির, আয়াত ৪৬)
ইসলামি তাফসিরে এই আয়াতকে কিয়ামতের আগে শাস্তির অস্তিত্বের অন্যতম দলিল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অর্থাৎ ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, পরকালের প্রতিদান ও শাস্তির বিষয়টি কেবল কিয়ামতের দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরযখের জীবন সম্পর্কেও কোরআন-হাদিসে আলোচনা রয়েছে।
মুমিনের মৃত্যুর সময় কী ঘটে?
মৃত্যুর মুহূর্তে একজন ঈমানদার মানুষের অবস্থা কেমন হবে, সে বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
সাহাবি বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে মুমিন ও অবিশ্বাসীর মৃত্যুর সময় এবং কবরের জীবনের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। বর্ণনাটি সুনানে আবু দাউদসহ একাধিক হাদিসগ্রন্থে এসেছে।
হাদিস অনুযায়ী, মুমিনের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা রহমত ও সুসংবাদ নিয়ে উপস্থিত হন। তাঁর আত্মা গ্রহণের পর সম্মানের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর কবরের জীবনে তাঁকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
তাঁর রব কে? তাঁর ধর্ম কী? তাঁর কাছে প্রেরিত রাসুল সম্পর্কে তিনি কী বিশ্বাস করতেন?
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহকে নিজের রব, ইসলামকে ধর্ম এবং মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর রাসুল হিসেবে স্বীকার করবেন।
এরপর তাঁর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হবে। কবর প্রশস্ত করে দেওয়া এবং জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়ার কথাও হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
নিজের সৎকর্মই আসবে সুন্দর রূপে
বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যের কথা এসেছে। মুমিনের কাছে সুন্দর চেহারা, পরিচ্ছন্ন পোশাক ও সুগন্ধিযুক্ত এক ব্যক্তি উপস্থিত হবেন। তাঁকে দেখে মুমিন জানতে চাইবেন, তিনি কে?
জবাবে ওই ব্যক্তি জানাবেন, তিনি তাঁর সৎকর্মের প্রতিরূপ।
এই বর্ণনার মাধ্যমে মানুষের পার্থিব জীবনের কাজ এবং পরকালের পরিণতির মধ্যে গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে। দুনিয়ায় মানুষের অনেক অর্জনই মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, তার ঈমান ও কর্মের হিসাব শেষ হয় না।
অবিশ্বাসীর জন্য কেমন পরিস্থিতির বর্ণনা রয়েছে?
একই হাদিসে অবিশ্বাসীর মৃত্যুর সময়ের বিপরীত অবস্থার কথাও বর্ণিত হয়েছে।
হাদিস অনুযায়ী, তাঁর আত্মা গ্রহণের সময় কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। কবরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতেও তিনি ব্যর্থ হন।
এরপর তাঁর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা এবং জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়ার বর্ণনা এসেছে।
হাদিসে আরও উল্লেখ রয়েছে, তাঁর কাছে কুৎসিত চেহারা ও দুর্গন্ধযুক্ত এক ব্যক্তি উপস্থিত হবেন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেকে ওই ব্যক্তির অসৎকর্মের প্রতিরূপ হিসেবে পরিচয় দেবেন। এসব বর্ণনা মানুষকে নিজের বিশ্বাস ও কর্ম সম্পর্কে সচেতন হওয়ার শিক্ষা দেয়।
তবে ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা মানুষের নেই। কে জান্নাতি বা জাহান্নামি হবেন, তার চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর হাতে।
কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাইতে বলেছেন রাসুল (সা.)
কবরের জীবন সম্পর্কে সতর্ক করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়েছেন। বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে এসেছে, এক আনসারি সাহাবির দাফনের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলেন।
অন্য হাদিসেও নামাজের মধ্যে কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার শিক্ষা পাওয়া যায়।
এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম শুধু পরকালের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করায় না; বরং সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং নিজের জীবন সংশোধনের পথও দেখায়।
কিয়ামতের দিন কী হবে?
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, বরযখের জীবন শেষে কিয়ামতের দিন মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে। সেদিন প্রত্যেককে নিজের কাজের হিসাব দিতে হবে। দুনিয়ায় মানুষ যা করেছে, তার ভালো-মন্দ কোনো কিছুই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে থাকবে না।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সুতরাং কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে তা দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে তাও দেখতে পাবে।’ (সুরা আজ-জিলজাল, আয়াত ৭-৮)
এই আয়াত মানুষের প্রতিটি কাজের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যদিকে, পরকালে ঈমানদারদের জন্য রয়েছে সুসংবাদও। কোরআনে সৎকর্মশীল মুমিনদের সঙ্গে তাঁদের ঈমানদার সন্তানদের মিলিত করার কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আমরা তাদের সঙ্গে তাদের সন্তান-সন্ততিকে মিলিত করব। আর তাদের কর্মের কোনো অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার উপার্জিত কর্মের জন্য দায়বদ্ধ।’ (সুরা আত-তুর, আয়াত ২১)
পরকালের প্রস্তুতি কি শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
ইসলামে পরকালের প্রস্তুতি বলতে কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতকে বোঝানো হয় না। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং অন্যের প্রতি ব্যবহারও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়মিত নামাজ আদায়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করা—সবই একজন মুসলমানের জীবন গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
একইভাবে সত্য কথা বলা, প্রতারণা না করা, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ না করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনও ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
কারণ ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী, মানুষের ওপর আল্লাহর অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি অন্য মানুষের অধিকারও রয়েছে। শুধু নিজের ইবাদতের বিষয়ে সচেতন হলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; অন্যের প্রতি অন্যায় করে থাকলে তা সংশোধন করা এবং প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুর আগে যে প্রশ্নটি নিজেকে করা প্রয়োজন
মানুষ ভবিষ্যতের জন্য কত পরিকল্পনাই না করে। কোথায় বাড়ি হবে, কীভাবে আয় বাড়বে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে—এসব চিন্তায় কেটে যায় জীবনের বড় একটি অংশ। কিন্তু যে ভবিষ্যৎ সবচেয়ে নিশ্চিত, সেই মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে কতটা ভাবা হয়?
কোরআন ও হাদিসের আলোচনায় বারবার এই আত্মজিজ্ঞাসার গুরুত্ব উঠে এসেছে।
আজ যে সময় হাতে আছে, আগামীকাল তা নাও থাকতে পারে। আজ যে ভুল সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, মৃত্যুর পর সেই সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। তবে ইসলামের শিক্ষা শুধু মৃত্যুভীতি সৃষ্টি করা নয়; বরং আল্লাহর রহমতের আশা রাখা, অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসা এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জীবনকে অর্থবহ করে তোলা।
মৃত্যু অবধারিত হলেও তার সময় মানুষের অজানা। তাই পরকালের প্রস্তুতি ভবিষ্যতের জন্য ফেলে না রেখে জীবনের প্রতিটি দিনকে ভালো কাজে কাজে লাগানোই কোরআন-হাদিসের অন্যতম শিক্ষা।
সূত্র: পবিত্র কোরআন—সুরা আলে ইমরান (১৮৫), সুরা আল-মুমিনুন (৯৯-১০০), সুরা গাফির (৪৫-৪৬), সুরা আত-তুর (২১), সুরা আজ-জিলজাল (৭-৮); সুনানে আবু দাউদে বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর বর্ণিত হাদিস; হাদীস বিডি।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর