ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায় না, দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে পায়ের স্নায়ু ও রক্তনালিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ছোটখাটো কাটা, ফোসকা কিংবা ত্বকের ক্ষত থেকেও তৈরি হতে পারে গুরুতর জটিলতা। তাই পায়ে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পায়ের স্নায়ুর ক্ষতি ও রক্ত চলাচলের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে পায়ে আঘাত লাগলেও অনেক সময় তা অনুভূত হয় না। আবার ক্ষত তৈরি হলে তা শুকাতেও দেরি হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে পায়ের টিস্যু নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পায়ের পাঁচটি লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১. পায়ে ঝিনঝিন, জ্বালাপোড়া বা অবশ ভাব
পায়ে বারবার ঝিনঝিন করা, জ্বালাপোড়া, সুচ ফোটানোর মতো অনুভূতি কিংবা পায়ের স্পর্শের অনুভূতি কমে যাওয়া ডায়াবেটিসজনিত স্নায়ুর ক্ষতির লক্ষণ হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি বলা হয়।
স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে পায়ে কাটা, ফোসকা কিংবা অন্য কোনো আঘাত লাগলেও তা টের পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ক্ষত দীর্ঘদিন অজানা থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পায়ে নতুন করে এসব লক্ষণ দেখা দিলে, অনুভূতি কমে গেলে কিংবা সমস্যা ক্রমশ বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

২. কাটা, ফোসকা বা ক্ষত সহজে শুকাচ্ছে না
ডায়াবেটিসে রক্ত চলাচলের সমস্যা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার পরিবর্তনের কারণে ক্ষত নিরাময়ে দেরি হতে পারে। ফলে সামান্য কাটা, ফোসকা কিংবা জুতার ঘষা থেকে তৈরি হওয়া ক্ষতও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
পায়ের ক্ষত দীর্ঘদিন না শুকালে, আকারে বড় হলে কিংবা পুঁজ, লালচে ভাব ও ফোলাভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে ক্ষতের সঙ্গে জ্বর, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া লালচে ভাব বা ত্বক কালচে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। ক্ষত নিজে নিজে শুকিয়ে যাবে—এমন ধারণা থেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করা বিপজ্জনক হতে পারে।
৩. পায়ের ত্বকের রং বা তাপমাত্রা বদলে যাওয়া
পায়ের ত্বক হঠাৎ ফ্যাকাশে, নীলচে বা কালচে হয়ে যাওয়া রক্ত চলাচলের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। একইভাবে একটি পা অন্যটির তুলনায় অস্বাভাবিক ঠান্ডা অনুভূত হলেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে পা লাল হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হওয়া কিংবা ফোলাভাব দেখা দেওয়া প্রদাহ, সংক্রমণ বা অন্য কোনো জটিলতার লক্ষণ হতে পারে।
বিশেষ করে পায়ের রং বা তাপমাত্রায় হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পা কালচে হয়ে যাওয়া বা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার সঙ্গে তীব্র ব্যথা কিংবা অসাড়তা থাকলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

৪. পা ফুলে যাওয়া বা আকৃতি বদলে যাওয়া
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির পা হঠাৎ ফুলে গেলে কিংবা পায়ের আকৃতিতে পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
পা অস্বাভাবিক গরম ও ফুলে যাওয়ার সঙ্গে আকৃতির পরিবর্তন দেখা দিলে তা ‘চারকো ফুট’ (Charcot foot) নামের গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এ অবস্থায় পায়ের হাড় ও জোড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্নায়ুর ক্ষতি থাকলে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হলেও ব্যথা কম অনুভূত হতে পারে।
দ্রুত চিকিৎসা না নিলে পায়ের গঠন বদলে যেতে পারে এবং হাঁটাচলায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই পা হঠাৎ ফুলে গেলে বা আকৃতি পরিবর্তিত হলে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে, দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
৫. ত্বক ফেটে যাওয়া, নখ মোটা হওয়া বা সংক্রমণ
পায়ের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে ফেটে গেলে জীবাণু প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আঙুলের ফাঁকে ছত্রাকের সংক্রমণ, নখ মোটা বা বিবর্ণ হয়ে যাওয়া এবং পায়ের তলায় কড়া পড়ার মতো সমস্যাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
ডায়াবেটিস থাকলে এসব সমস্যার সঙ্গে ক্ষত বা সংক্রমণ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই পায়ের ত্বকের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত নখ ও আঙুলের ফাঁক পরীক্ষা করা জরুরি।
তবে নিজে ব্লেড বা ধারালো যন্ত্র দিয়ে কড়া কিংবা শক্ত চামড়া কাটতে যাওয়া উচিত নয়। এতে ক্ষত তৈরি হয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত পা-পরিচর্যা বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে।
ডায়াবেটিসে পায়ের যত্ন নেবেন যেভাবে
পায়ের এসব সমস্যা এড়াতে প্রতিদিন কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। যেমন—
প্রতিদিন পা পরীক্ষা করুন: পায়ের তলা, গোড়ালি, আঙুলের ফাঁক ও নখের চারপাশে কাটা, ফোসকা, ফাটল বা রঙের পরিবর্তন আছে কি না দেখুন। প্রয়োজনে আয়না ব্যবহার করুন।
সঠিক মাপের জুতা পরুন: আঁটসাঁট জুতা এড়িয়ে চলুন। জুতার ভেতরে পাথর বা অন্য কোনো বস্তু আছে কি না, পরার আগে দেখে নিন।
খালি পায়ে হাঁটবেন না: ঘরের ভেতরেও পায়ে আঘাত লাগতে পারে। তাই উপযুক্ত স্যান্ডেল বা জুতা ব্যবহার করুন।
পা পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন: প্রতিদিন কুসুম গরম পানি দিয়ে পা পরিষ্কার করুন। বিশেষ করে আঙুলের ফাঁক ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার করবেন না।
ত্বকের শুষ্কতা দূর করুন: প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। তবে আঙুলের ফাঁকে ময়েশ্চারাইজার লাগাবেন না, কারণ সেখানে অতিরিক্ত আর্দ্রতা ছত্রাকের সংক্রমণ বাড়াতে পারে।
নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: পায়ে অনুভূতি কমে গেলে, রক্ত চলাচলের সমস্যা থাকলে কিংবা আগেও পায়ে ক্ষত হয়ে থাকলে নিয়মিত পা পরীক্ষা করানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পায়ে নতুন ক্ষত, ফোসকা, পুঁজ, অস্বাভাবিক ফোলাভাব কিংবা লালচে ও গরম হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পা কালচে হয়ে যাওয়া, হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা গুরুতর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
মনে রাখবেন, ডায়াবেটিসে পায়ের সমস্যা সব সময় ব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। তাই ব্যথা না থাকলেও পায়ে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। নিয়মিত পা পরীক্ষা, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর