বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে আসছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হেফাজতে থাকা তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’ শাহরিয়ার রেজা দীপ জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার রাতের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তুরাগ নদের কাছ থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করেছে তদন্তকারী সংস্থা।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ তুরাগ নদের পাড়ে কথা বলছিলেন। একপর্যায়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। এ সময় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং তিনি পালিয়ে যান।
তবে দীপের এই বক্তব্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তকারীরা।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সেগুলো এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এদিকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পিবিআই।
পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, তুরাগ নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মোটরসাইকেলটি পাওয়া গেছে। এটি তাহসিফের কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেক পুলিশ সুপার জানান, দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। নম্বরপ্লেট না থাকায় এর মালিকানা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।
তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, নিখোঁজ হওয়ার দিন তাহসিফও নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন।
তাহসিফের বাসার দারোয়ানের বক্তব্যেও উঠে এসেছে নতুন তথ্য। তার দাবি, ঘটনার দিন রাতে দীপের সঙ্গে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। কিন্তু রাত আড়াইটার দিকে দীপ একাই ফিরে আসেন।
দারোয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেরার পর দীপের আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। তিনি চোখে চোখ রেখে কথা বলছিলেন না এবং মিটিমিটি হাসছিলেন।
দারোয়ানের এই দাবি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে তার বর্ণনার সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দীপের ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হন তার ছেলে।
ওই দিন রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মায়ের মোবাইলে একটি বার্তা পাঠিয়ে তাহসিফ জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে দীপের সাক্ষাতের একটি সিসিটিভি ফুটেজও সামনে এসেছে।
ফুটেজে দেখা যায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছেন সবুজ পাঞ্জাবি পরা তাহসিফ। একপর্যায়ে তারা হাত মেলান এবং পরে আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে শাহরিয়ার রেজা দীপ হিসেবে শনাক্ত করেছেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা দেখা দেওয়ায় তারা একটি ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। মোটরসাইকেল মেরামতের পর বাসায় ফিরে খাবার খান। এরপর সেখান থেকে চলে যান।
তবে দীপের আগের বক্তব্য এবং জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্যের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন।
হাতে থাকা ঘড়ি ও পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফ সাউরির বলে শনাক্ত করা হয়।
পরদিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
একই দিন বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যু দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের আশঙ্কা, ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা এখন দীপের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন আলামত যাচাই করছেন। তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল না পাওয়া পর্যন্ত তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জাতীয় এর সর্বশেষ খবর