ইলিশের টেকসই উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শেষে বুকভরা আশা নিয়ে নদীতে নেমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাচ্ছেন না ভোলার সাধারণ জেলেরা। উল্টো বিভিন্ন মাছঘাটে বিক্রির জন্য আসছে ডিমওয়ালা ও নষ্ট ইলিশ। জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময় সাধারণ জেলেরা মাছ ধরতে না পারলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অনেক বোটে প্রকাশ্যে মা ইলিশ শিকার করা হয়েছে।
জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় শিকার করা এসব মাছ দীর্ঘদিন বোটে মজুত রাখা হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর বোটগুলো ঘাটে ফিরতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণে থাকায় ধরা ইলিশের একটি অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে নদীতে গিয়ে সাধারণ জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত মাছ ধরা পড়ছে না। ফলে অনেকেরই উঠছে না মাছ ধরার জ্বালানি খরচ।
জেলেদের অভিযোগের বিষয়ে ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ও তুলাতুলি মাছঘাট ঘুরে দেখা যায়, মেঘনা নদীর তীরে বাঁধা বড় বড় ফিশিংবোট থেকে প্লাস্টিকের ট্রেতে করে ডিমওয়ালা ইলিশ আড়তে তোলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব বোটে থাকা ইলিশের প্রায় ৭০ শতাংশই ডিমওয়ালা। অনেক মাছের গায়েও লালচে বর্ণ দেখা গেছে।
এদিকে চরফ্যাশন উপজেলার সামরাজ মাছঘাট ও আশপাশের এলাকায় পচা ইলিশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে শিকার করা ইলিশ বোটে মজুত রাখা হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে বোটগুলো ঘাটে ফিরলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণে থাকা মাছের একটি অংশ পচে যায়। পরে সেসব মাছ তীরে ও খালে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই মাছ ধরার কথা স্বীকার
ইলিশা মাছঘাটে বোট নিয়ে আসা মালিক আবু তাহের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই মাছ ধরতে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার চার দিন আগে ইলিশ ধরতে বের হন। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর অর্থাৎ মোট ছয় দিন পর ঘাটে ফেরেন। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার পিস ইলিশ ধরেছেন। বিক্রি করেছেন পাঁচ লাখ টাকার মাছ। তবে দীর্ঘদিন বোটে মজুত থাকায় কিছু মাছ নষ্ট হয়েছে এবং অধিকাংশ মাছ লালচে বর্ণ ধারণ করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে আবু তাহের বলেন, ‘যে যে ঝামেলা করতে চাইছে তাকেই ম্যানেজ করেছি। শত শত বোট নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ ধরেছে। এবারের নিষেধাজ্ঞা অতটা কড়াকড়ি হয়নি।’
একই ধরনের কথা বলেন পাশের ট্রলারের জেলে শাহে আলম, নাজিমুদ্দিন, ইয়াছিন, লোকমান, রহিম ও রশিদ বেপারী।
নদীতে মাছ না পেয়ে হতাশ সাধারণ জেলেরা
অন্যদিকে নদীতে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন জেলে সহিদুল, আব্দুল্লাহ, কবির, মনির, সাইদুল ও জাহিদ। তাঁদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা ছিল মূলত দরিদ্র জেলেদের জন্য। প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বোটগুলোতে অবাধে মা ইলিশ শিকার করে মজুত রাখা হয়েছে। এখন নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় সেসব বোট ঘাটে ভিড়িয়ে মাছ বিক্রি করা হচ্ছে।
তাঁরা আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মা ইলিশ শিকার করায় এখন নদীতে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি জ্বালানি খরচও উঠছে না। অন্যান্য বছর এ সময়ে নদীতে কিছু ‘জমা ইলিশ’ পাওয়া গেলেও এবার তা মিলছে না। এতে ইলিশের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযানে প্রশাসনের উদাসীনতার অভিযোগ
সামরাজ মৎস্যঘাটের সভাপতি মো. আজিজ বলেন, এ বছর মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে কিছু জেলে ইলিশ শিকার করেছেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন ছিল। তাহলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মা ইলিশ ধরা বন্ধ করা সম্ভব হতো বলে তিনি মনে করেন।
তবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে যথাসাধ্য চেষ্টা করার কথা জানিয়েছেন ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন। তিনি বলেন, মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের ২২ দিনে ভোলার সাত উপজেলা থেকে ২১৫ জন জেলেকে আটক করে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় জাল ও মাছের পাশাপাশি ১৬টি ট্রলার এবং ৩৮টি নৌকা জব্দ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সীমিত জনবল নিয়েও নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করেছেন তাঁরা। তবে প্রকল্প ও সরকারি পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা না পাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি বাস্তবায়নে বেগ পেতে হয়েছে।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর