পিরোজপুরে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননা (গার্ড অব অনার) প্রদানে বিঘ্ন ঘটানোর প্রতিবাদে বরগুনায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল ১১টায় বরগুনা জেলা প্রেসক্লাব চত্বরে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বরগুনা জেলা ইউনিট কমান্ডের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন, মৃত্যুর পর তাদের জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়া কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানে বিঘ্ন সৃষ্টি করা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য। একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ের সময় এমন আচরণ শুধু তাঁর পরিবারের প্রতি অবমাননা নয়, বরং দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতিও চরম অসম্মান।
কর্মসূচির শুরুতে বামনার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইব্রাহিম পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন। পরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বরগুনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক মো. ইউসুফ আলী মৃধা।
সমাবেশে বক্তব্য দেন বরগুনা জেলা জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের আহ্বায়ক সভাপতি এ জেড এম সালেহ ফারুক, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুখরঞ্জন শীল, মো. হাবিবুর রহমান, মো. আবু হানিফ, জাহাঙ্গীর আলম, মো. মজিবর শরীফ, নজির আহমেদ ও হারুন অর রশিদ শিকদারসহ অন্যান্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানগণ।
এসময় বক্তারা বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পদ নন, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের অবদান দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তার জানাজা, দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। সেখানে বাধা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তারা আরও বলেন, পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রতিটি মানুষের কাছে এ ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবদ্দশায় যথাযথ মূল্যায়নের পাশাপাশি মৃত্যুর পরও তাঁদের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরসহ যেকোনো মহলের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা বা তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানে বাধা সৃষ্টির অপচেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তবে এ ঘটনায় কারা জড়িত, কী কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং এর পেছনে কারও পরিকল্পিত ভূমিকা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটনের দাবি জানান তারা।
বক্তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশে তাদের শেষ বিদায় যেন কোনোভাবেই অসম্মানজনক পরিস্থিতির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পিরোজপুরের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা, দাফন কিংবা গার্ড অব অনার প্রদানের ক্ষেত্রে যাতে কেউ বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে মো. ইউসুফ আলী মৃধা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষা করা মানে দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সম্মান রক্ষা করা। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে অসম্মানজনক পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ প্রশমিত হবে না।
মানববন্ধন থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদানে বিঘ্ন ঘটানোর ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন অংশগ্রহণকারীরা।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর