কর্মব্যস্ততা, কাজের চাপ, পারিবারিক টানাপোড়েন কিংবা নানা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে মানসিক চাপে পড়েন অনেকেই। দীর্ঘস্থায়ী এই চাপ শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন এনে মানসিক চাপের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা পাওয়া সম্ভব।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘এভরিডে হেলথ’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সুষম খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ম্যাগনেশিয়াম, জিংক, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও নিয়াসিনের মতো পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় উঠে এসেছে, অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য বা ‘গাট মাইক্রোবায়োম’-এর সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে খাবার শুধু শারীরিক সুস্থতাই নয়, মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, খাদ্যতালিকায় কয়েকটি পরিচিত খাবার রাখলে মানসিক চাপ সামলাতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারে।
এমন ১০টি খাবারের কথা জানিয়েছে এভরিডে হেলথ।
১. ভেষজ চা ও গ্রিন টি
মানসিক ক্লান্তি কাটাতে এক কাপ গরম চা হতে পারে স্বস্তির সঙ্গী। ক্যামোমাইল ও ল্যাভেন্ডারের মতো ভেষজ চা শরীর ও মনকে শিথিল করতে সহায়তা করতে পারে। পুষ্টিবিদ স্যান্ড্রা মায়ারোভিৎসের মতে, এসব চা স্নায়ুকে প্রশান্ত করতে ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে গ্রিন টি-তে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড মস্তিষ্কের কোষের সুরক্ষায় সহায়ক। পুষ্টিবিদ অ্যালিস ফিগেরোয়ার মতে, কাজের ফাঁকে সতেজতা পেতে গ্রিন টি ভালো বিকল্প। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, এক কাপ গ্রিন টি-তে প্রায় ২৮ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। একই পরিমাণ ব্ল্যাক কফিতে ক্যাফেইনের পরিমাণ প্রায় ৯৬ মিলিগ্রাম। তাই তুলনামূলক কম ক্যাফেইন গ্রহণ করতে চাইলে গ্রিন টি বেছে নেওয়া যেতে পারে।

২. ডার্ক চকোলেট
মন ভালো করতে মাঝেমধ্যে এক টুকরো ডার্ক চকোলেট খেতে পারেন। এর স্বাদ ও উপভোগের অনুভূতি সাময়িক আনন্দ দিতে পারে। পাশাপাশি এতে থাকা কোকোতে রয়েছে বিভিন্ন উপকারী উপাদান।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, টানা দুই সপ্তাহ প্রতিদিন প্রায় দেড় আউন্স ডার্ক চকোলেট খেলে শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমতে পারে। ২০২২ সালের আরেক গবেষণায় ৮৫ শতাংশ কোকোযুক্ত ডার্ক চকোলেট অন্ত্রের অণুজীবের গঠনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উঠে এসেছে। তবে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরির কথা বিবেচনায় রেখে পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
৩. গোটা শস্য বা হোল গ্রেইন
সাদা রুটি, বিস্কুট কিংবা পরিশোধিত শর্করার পরিবর্তে খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন গোটা শস্য। ব্রাউন রাইস, হোল রাই এবং বাকহুইটের মতো খাবারে রয়েছে ফাইবার, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান।
শর্করাজাতীয় খাবার মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এই রাসায়নিক উপাদান মেজাজ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের তথ্য অনুযায়ী, গোটা শস্য ধীরে হজম হয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত ওঠানামা করার আশঙ্কা কমে।
৪. অ্যাভোকাডো
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ অ্যাভোকাডোতে রয়েছে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইবার ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান। এতে থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।
২০২১ সালের একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অ্যাভোকাডোর ফাইটোকেমিক্যাল, প্রিবায়োটিক ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি ধরন হলো এএলএ (ALA)। তবে অ্যাভোকাডোকে উদ্বেগ বা মানসিক চাপ কমানোর সরাসরি চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
৫. চর্বিযুক্ত সামুদ্রিক মাছ
মানসিক সুস্থতা ও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষায় খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন চর্বিযুক্ত মাছ। সালমন, সার্ডিন, ম্যাকারেল, হেরিং ও টুনার মতো মাছে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।
হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং ও আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ওমেগা-৩ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিছু গবেষণায় বিষণ্নতার উপসর্গ কমানোর ক্ষেত্রেও এর সম্ভাব্য উপকারিতার কথা উঠে এসেছে। যারা মাছ খান না, তাঁরা আখরোট, তিসিবীজ ও সামুদ্রিক শৈবাল থেকে উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ পেতে পারেন।
৬. হালকা গরম দুধ
রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ পান করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। এটি ঘুমের আগে আরামদায়ক অনুভূতি তৈরি করতে পারে। দুধে থাকা ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি স্নায়ুতন্ত্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
স্লিপ অ্যাডভাইজরের তথ্য অনুযায়ী, ঘুমের আগে উষ্ণ পানীয় পান করার অভ্যাস মন ও শরীরকে শিথিল করতে সহায়তা করতে পারে। ২০২৩ সালের একটি জরিপেও খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়ামের পরিমাণের সঙ্গে বিষণ্নতার উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
৭. বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার
কাঠবাদাম, পেস্তা, আখরোট, সূর্যমুখীর বীজ ও কুমড়ার বীজ পুষ্টির ভালো উৎস। এসব খাবারে রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন বি, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান।
ম্যাগনেশিয়াম স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় নিয়মিত আখরোট খাওয়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক চাপের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে বাদামে ক্যালরির পরিমাণ বেশি হওয়ায় প্রতিদিন এক মুঠো পরিমাণ খাওয়াই যথেষ্ট।
৮. লেবুজাতীয় ফল ও স্ট্রবেরি
কমলা, মাল্টা, গ্রেপফ্রুট ও স্ট্রবেরির মতো ফলে প্রচুর ভিটামিন সি রয়েছে। এই ভিটামিন শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখার পাশাপাশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন সি গ্রহণ মানসিক চাপের সময় শরীরের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। একটি গবেষণায় প্রতিদিন ৫০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি গ্রহণের সঙ্গে উদ্বেগ ও মানসিক চাপের উপসর্গ কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ফলমূল থেকেই পাওয়ার চেষ্টা করা ভালো।
৯. প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার
অন্ত্রের সুস্থতা ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার সহায়ক হতে পারে।
দই, কেফির, কম্বুচা ও মিসো স্যুপ এ ধরনের খাবারের পরিচিত উদাহরণ। হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রোবায়োটিক হজমপ্রক্রিয়া ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় Lactobacillus plantarum নামের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমার সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই খাদ্যতালিকায় প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে।

১০. উচ্চমাত্রার ফাইবারযুক্ত খাবার
মটরশুঁটি, বিভিন্ন ধরনের শিম, বেরি, ব্রকলি, কেল ও তিল উচ্চ ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার। এসব খাবার হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
মায়ো ক্লিনিক ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর (ইউসিএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে শরীরে এপিনেফ্রিন ও কর্টিসলের মতো হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে উদ্বেগ, ক্লান্তি ও বিরক্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনই কি যথেষ্ট?
মানসিক চাপ মোকাবিলায় সুষম খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু খাবারের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, বিশ্রাম এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোও মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনুভূত হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: এভরিডে হেলথ
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর