লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলের আগে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করছে কিছু বাণিজ্যিক জাহাজের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। জাহাজের পরিচয়, মালিকানা ও সম্ভাব্য যাত্রাপথের তথ্য পাঠিয়ে নিরাপদে চলাচলের নিশ্চয়তা চাইছে তারা। কোনো কোনো জাহাজের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একটি অনানুষ্ঠানিক ই-মেইল ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা কতটা বদলে গেছে, এ ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজ পরিচালনাকারীরা হুথিদের প্রতিষ্ঠিত ‘হিউম্যানিটারিয়ান অপারেশনস কো-অর্ডিনেশন সেন্টার’ (এইচওসিসি)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রের কাছে জাহাজের পরিচয়, গন্তব্য ও সম্ভাব্য যাত্রাপথের তথ্য পাঠানো যায়।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাহাজের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা ইসরায়েলের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এরপর লোহিত সাগর দিয়ে নিরাপদে চলাচলের নিশ্চয়তা চাওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণত প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এসব আবেদনের জবাব দেয় হুথিরা। আবেদন পর্যালোচনার পর কোনো কোনো জাহাজকে যাত্রার বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
এই ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের উদাহরণও তুলে ধরেছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। চীনের কনটেইনারবাহী জাহাজ ‘ঝং চেং চাং লিং’-এর পক্ষ থেকে হুথিদের কাছে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হয়েছিল। জাহাজটির পরিচয় ও পরিকল্পিত যাত্রার তথ্য পর্যালোচনার পর হুথিরা সাত দিনের জন্য চলাচলের অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে যাত্রাপথে জাহাজটির স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএস চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এআইএসের মাধ্যমে একটি জাহাজের পরিচয়, অবস্থান, গতি ও চলাচলের দিক সম্পর্কে তথ্য সম্প্রচারিত হয়। ফলে অন্য জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটির অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। তবে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের তথ্য জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করে হামলার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে বলে নিরাপত্তা সতর্কতায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত দুটি ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে—লোহিত সাগর দিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে যাওয়া, নাকি নিরাপত্তার কারণে পুরো অঞ্চল এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি ভারত মহাসাগরকে সুয়েজ খালের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। হুথিদের হামলার ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচলের পথ বেছে নিয়েছে। এতে জ্বালানি খরচ, সময় ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিষ্ঠান লোহিত সাগর দিয়ে যাত্রা অব্যাহত রাখতে হুথিদের কাছ থেকে নিরাপদে চলাচলের আশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এই ই-মেইল ব্যবস্থা ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে, লোহিত সাগরে প্রবেশের আগে সব জাহাজকে হুথিদের অনুমতি নিতে হবে। হুথিদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই—এমন জাহাজ চলাচল করতে পারবে। তবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণার পর কিছু প্রতিষ্ঠান বাড়তি সতর্কতা হিসেবে এইচওসিসির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জাহাজগুলোকে এইচওসিসির সঙ্গে যোগাযোগ বা সেখানে নিবন্ধন না করার পরামর্শ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সতর্কবার্তাতেও হুথিদের কাছ থেকে আসা নির্দেশনা অনুসরণ না করার কথা বলা হয়েছে। কারণ, জাহাজের অবস্থান ও চলাচলের তথ্য সরবরাহ করলে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, হুথিদের দেওয়া অনুমতিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো নৌ চলাচলের ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে তারা। এসব হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে উত্তেজনা নতুন করে বাড়ার পর হুথিরা দেশটির বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে। সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচল বন্ধের হুমকির পাশাপাশি দেশটির ভূখণ্ড ও জ্বালানি স্থাপনাতেও হামলার ঘটনা ঘটে। এতে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
সব মিলিয়ে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে হুথিদের এই ই-মেইল ব্যবস্থা নতুন এক বাস্তবতা তুলে ধরছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে নিরাপদে চলাচলের আশ্বাস চাইছে কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ। এতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর