ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব বিরোধী নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের হাতে তুলে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। তবে নতুন সরকার গঠনের পথ এখনো বেশ জটিল। নেতানিয়াহুর দল লিকুদ, অতি-ধর্মীয় দল এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ।
টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। রোববার বিকেল ৫টায় জেরুজালেমে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এরপর সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন আইজেনকোট। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন।
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় আইজেনকোটের পক্ষে ৬৭ জন সংসদ সদস্য সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন ৪৬ জন। সাত সদস্যের ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম কোনো প্রার্থীর পক্ষেই সুপারিশ করেনি।
তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পেলেও সরকার গঠনের পথ সহজ নয় আইজেনকোটের জন্য। তার নেতৃত্বাধীন জোটের কয়েকটি দল আরব নেতৃত্বাধীন রা'আম ও জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে নির্বাচনের আগে আইজেনকোটের জোটের অনেক নেতা নেতানিয়াহু ও অতি-ধর্মীয় দলগুলোকে ক্ষমতার বাইরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
নেতানিয়াহুর ঐক্য সরকারের প্রস্তাব
এদিকে শনিবার এক ভিডিওবার্তায় জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে তার প্রস্তাবিত সরকারে নিজের বর্তমান জোটের সব শরিককে অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত দিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে কট্টর ডানপন্থী রিলিজিয়াস জায়নিজম, ওতজমা ইয়েহুদিত এবং অতি-ধর্মীয় দলগুলো।
নেতানিয়াহু দাবি করেন, আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সরকার ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। এমনকি হামাসের সমর্থকদের ওপর নির্ভরশীল সরকার হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে আইজেনকোটের দল ইয়াশার নেতানিয়াহুর প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির বক্তব্য, লিকুদ ও তার সহযোগীরা চাইলে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে পারে। তবে এজন্য তাদের কট্টরপন্থী দলগুলোর সঙ্গে জোট ভাঙতে হবে এবং আইজেনকোটের নির্ধারিত চারটি নীতি মেনে নিতে হবে।
আইজেনকোট স্পষ্ট জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোনো সরকারে অংশ নেবেন না তিনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সময় গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও জনজীবন থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।
অতি-ধর্মীয় দলগুলোর অবস্থান নিয়ে নতুন হিসাব
আইজেনকোটের সরকার গঠনের প্রচেষ্টায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে অতি-ধর্মীয় দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) ও শাস পার্টিকে ঘিরে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউটিজে যদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে শাস পার্টি তাতে বাধা না-ও দিতে পারে। তবে শাস পার্টি এ ধরনের খবরকে ভুয়া বলে দাবি করেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির নেতা আভিগদর লিবারম্যান অতি-ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। নেতানিয়াহু ও আরব দলগুলোকে বাদ দিয়ে নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে তিনি সামরিক বাহিনীতে অতি-ধর্মীয় তরুণদের বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিষয়ে কিছু ছাড় দিতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ৪৮ সদস্যের জোটের সঙ্গে ইউটিজের সাত সদস্য এবং শাসের ছয় সদস্যের বিরোধিতা না পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে পার্লামেন্টে ৬১ সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত হতে পারে।
সামরিক বাহিনীতে অতি-ধর্মীয়দের নিয়োগ নিয়ে বিরোধ
তবে অতি-ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের প্রশ্ন।
আইজেনকোটের জোটের নেতারা নির্বাচনের আগে অতি-ধর্মীয় পুরুষদের ব্যাপক সামরিক ছাড় প্রত্যাহার এবং সামরিক বাহিনীতে তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
শনিবার ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানও অতি-ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তবে তিনি সামরিক নিয়োগ, কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
আইজেনকোটের ঘোষিত চারটি মূলনীতির মধ্যে রয়েছে—ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ মেনে চলা, হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার সামরিক ও শাসনক্ষমতা ধ্বংসের অঙ্গীকার এবং সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক, জাতীয় বা বেসামরিক সেবা নিশ্চিত করা।
সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেও আইজেনকোটকে এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করতে হবে। অতি-ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন, আরব দলগুলোর ভূমিকা এবং নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির অবস্থানই শেষ পর্যন্ত নতুন সরকার গঠনের সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর