যে মাটিতে জীবনের প্রথম দেড়টি বছর কেটেছিল, সেই মাটিতেই একদিন ফিরে আসবেন, হয়তো এমন একটি স্বপ্ন বুকের ভেতর লালন করেছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু যে মা তাকে জন্ম দিয়েছেন, যে বাবা প্রথমবার কোলে নিয়েছিলেন, তাদের মুখ কেমন ছিল, তা জানার সুযোগও হয়নি তার। বয়স যখন মাত্র দেড় বছর, তখনই পাড়ি জমাতে হয়েছিল হাজার হাজার মাইল দূরের দেশ নেদারল্যান্ডসে। এরপর কেটে গেছে ৪৫ বছর। সময়ের স্রোতে বদলে গেছে জীবন, বদলে গেছে ঠিকানা। কিন্তু শিকড়ের টান যেন মুছে যায়নি।
সেই টানেই আবার বাংলাদেশের কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাটে ফিরে এসেছেন সেলিনা গোমেজ। বয়স এখন ৪৬ বছর। তার হাতে শৈশবের একটি পুরোনো ছবি, সঙ্গে নেদারল্যান্ডসে যাওয়ার সময়কার পাসপোর্টের ফটোকপি। এই সামান্য স্মৃতিচিহ্ন নিয়েই তিনি খুঁজছেন জন্মদাতা মা-বাবা ও হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের। মালুমঘাট, খুটাখালীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি। কারও কাছে জানতে চাইছেন নিজের পরিবারের ঠিকানা, কারও হাতে তুলে দিচ্ছেন স্বজনদের খুঁজে পাওয়ার আকুতি।
১৯৮১ সালের ৭ জুলাই, মাত্র দেড় বছর বয়সে দত্তক নেওয়া পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশ ছেড়ে নেদারল্যান্ডসে চলে যান সেলিনা। জন্মস্থান মালুমঘাট। তার কাছে থাকা পাসপোর্টের ফটোকপিতে জন্মতারিখের পাশাপাশি জাতীয়তা বাংলাদেশি উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে তিনি নেদারল্যান্ডসের নাগরিক। তবে নাগরিকত্ব বদলালেও জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্কের সুতোটি ছিঁড়ে যায়নি।
বাংলাদেশে এসে সেলিনা গোমেজ বাংলায় কথা বলতে পারেন না। বেড়ে উঠেছেন একটি ডাচ পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসায়। দত্তক নেওয়া পরিবার তাকে আদর-যত্নে বড় করেছে, দিয়েছে নিরাপদ জীবন। তবু নিজের জন্মদাতা মা-বাবা এবং রক্তের সম্পর্কের মানুষদের জানার আকাঙ্ক্ষা তাকে বারবার ফিরিয়ে এনেছে বাংলাদেশে।
ইংরেজিতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সেলিনা বলেন, ‘আমি আমার মা-বাবাকে খুঁজছি। তাদের খুব মিস করি। তাদের চেহারা বা স্মৃতি আমার মনে নেই। কিন্তু জানি, আমার মায়ের নাম হেলেনা গোমেজ এবং বাবার নাম বেনেডি গোমেজ। নেদারল্যান্ডসে আমি অনেক সময় একাকিত্ব অনুভব করি। আমার আশা, একদিন মা-বাবাসহ নিজের পরিবারের সবাইকে খুঁজে পাব।’
নিজের জন্ম ও বাংলাদেশ ছাড়ার স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘আমার জন্ম মালুমঘাটে। দেড় বছর বয়সে একজন নারী আমাকে ঢাকায় নিয়ে যান। সেখান থেকে একটি ডাচ পরিবার আমাকে দত্তক নিয়ে নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যায়। তারা আমাকে অনেক আদর-যত্নে বড় করেছেন। তাদের কাছে আমি ভালোবাসা পেয়েছি। কিন্তু আমার আসল পরিবার বাংলাদেশে। আমি তাঁদের সঙ্গে আবার একত্রিত হতে চাই।’
সেলিনার কথায় স্পষ্ট, এই অনুসন্ধান কেবল কয়েকজন মানুষের পরিচয় জানার চেষ্টা নয়; বরং নিজের জীবনের শুরুর অধ্যায়টিকে ফিরে পাওয়ার আকুতি। যে মা-বাবার কোলে শৈশবের প্রথম দিনগুলো কেটেছে, তাদের সম্পর্কে জানার ইচ্ছা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। হয়তো কোথাও বেঁচে আছেন তার মা-বাবা, হয়তো আছেন ভাই-বোন কিংবা অন্য স্বজনেরা। তাদের কেউ কি জানেন, ৪৫ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই শিশুটি আজ নেদারল্যান্ডস থেকে ফিরে তাদের খুঁজছেন?
সেলিনার বাংলাদেশ সফরে গাইড বা ভ্রমণসহকারী হিসেবে রয়েছেন রাসেল আলম নামে এক যুবক।
তিনি জানান, পরিবারের সন্ধানে এর আগেও একাধিকবার নেদারল্যান্ডস থেকে বাংলাদেশে এসেছেন সেলিনা। এবারও তিনি আরও ১০ থেকে ১৫ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করবেন। এই সময়ের মধ্যে চকরিয়ার মালুমঘাট, খুটাখালীসহ আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে পরিবারের সন্ধান চালিয়ে যাবেন তারা।
রাসেল আলম বলেন, ‘সেলিনা তার মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পেতে খুবই আগ্রহী। এ জন্য আমরা বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলছি। তার কাছে থাকা পুরোনো ছবি ও পাসপোর্টের কপিও দেখানো হচ্ছে। আমরা আশা করছি, কারও না কারও মাধ্যমে তার পরিবারের সন্ধান পাওয়া যাবে।’
সেলিনা গোমেজ গত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশে এসেছেন। তার কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, মায়ের নাম হেলেনা গোমেজ এবং বাবার নাম বেনেডি গোমেজ। জন্মস্থান মালুমঘাট। এই পরিচয় ও পুরোনো ছবিই এখন তার পরিবারের কাছে পৌঁছানোর প্রধান অবলম্বন।
৪৫ বছর আগে যে শিশুটি মালুমঘাট ছেড়ে অজানা এক ভবিষ্যতের পথে পা বাড়িয়েছিল, সেই শিশুই আজ পূর্ণবয়স্ক নারী হয়ে ফিরে এসেছেন জন্মভূমিতে। তার হাতে নেই শৈশবের স্মৃতির অ্যালবাম, নেই মা-বাবার সঙ্গে কাটানো কোনো মুহূর্তের ছবি। আছে কেবল একটি পুরোনো ছবি, কিছু নথি আর বুকভরা প্রশ্ন।
সেলিনা গোমেজের পরিবারের সন্ধান পেলে অথবা তার মা-বাবা, ভাই-বোন কিংবা কোনো স্বজনের কাছে তার বাংলাদেশে ফেরার খবর থাকলে যোগাযোগের অনুরোধ জানিয়েছেন রাসেল আলম।
যোগাযোগ: ০১৭১৮-৬০৪৩৪৭
ই-মেইল: [email protected]
হয়তো মালুমঘাটের কোনো এক বাড়িতে আজও কেউ অপেক্ষা করে আছেন হারিয়ে যাওয়া মেয়েটির স্মৃতি নিয়ে। হয়তো কোনো স্বজনের কাছে এখনো সংরক্ষিত আছে তার শৈশবের কোনো গল্প। সেই মানুষগুলোর কাছে সেলিনার এই ফিরে আসার খবর পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
৪৫ বছরের ব্যবধান ঘুচিয়ে একটি মা-মেয়ের দেখা হবে কি না, তা জানা নেই। তবে সেলিনার অপেক্ষা এখন একটাই, একবার যদি খুঁজে পাওয়া যায় জন্মদাতা মা-বাবাকে, একবার যদি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, এত বছর পরও তিনি তাদের ভুলে যাননি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর