একজন নগ্নপদ ডাক্তার ও তার চিকিৎসা সেবা 

২০ মে, ২০১৮ ১৩:০৯:৫২

ছবিতে তরুণ বেয়ারফুট ডাক্তার গর্ডন লিউ।

চীনের চেয়ারম্যান মাও ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসে এক ঘোষণা জারি করেন। তিনি বলেন যে চীনের গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চান।

এর জন্য তিনি হাজার হাজার লোক নিয়োগ করেন। মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার প্রশিক্ষণ দিয়ে এদের তিনি গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়তে বলেন।

এদের ডাকা হতো ‘বেয়ারফুট ডাক্তার’ বা নগ্নপদ ডাক্তার নামে। কারণ জনগণের চিকিৎসার পাশাপাশি তারা মাঝেমধ্যে নেমে পড়তেন ফসলের ক্ষেতে, সাহায্য করতেন কৃষকদের।

গর্ডন লিউ ছিলেন হাই স্কুল পাশ। তিনি ১৯৭৪ সালে তার নিজের গ্রামে নগ্নপদ ডাক্তার হিসেবে নিয়োগ পান। তার গ্রাম ছিল সেচুয়ান প্রদেশের মাও শিয়ান কাউন্টিতে।

লিউ বলছেন, এই চাকরি পেয়ে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। সেই সময়ে যুবকদের জন্য এই গ্রামীণ ডাক্তারের পদ ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয় চাকরি।

তিনি বলছিলেন, এটা না করলে তাকে হয়তো একজন পূর্ণকালীন কৃষক হিসেবে কাজ করতো হতো। এতে কৃষি খামারে তাকে এতই ব্যস্ত থাকতে হতো যে বিশ্রাম নেয়ার কোন ফুসরত পাওয়া যেত না।

মি. লিউ বলছিলেন, গ্রামীণ ডাক্তার হিসেবে তারা খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতেন মানুষের দোরগোড়ায়। ঠান্ডা লাগা, ডায়রিয়া, কিংবা সংক্রমণের মত রোগের ওষুধ তারা গ্রামের মানুষদের মধ্যে বিতরণ করতেন।

মেডিকেল চিকিৎসার ওপর তিনি কোন আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পাননি। তার যা কিছু শিক্ষা সেটা তিনি পেয়েছিলেন সেখানকার এক বৃদ্ধ গ্রামীণ ডাক্তারের কাছ থেকে, যিনি কিছুদিন পরেই অবসরে চলে যান।

গর্ডন লিউ বলছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই যদি তিনি ভালভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তাহলে আমিই বা পারবো না কেন? তার কাছ থেকে ভালভাবে কাজ শিখে নিতে হবে। আমার দায়িত্ব নিয়ে আমি মোটেই নার্ভাস ছিলাম না।’

এর কয়েক বছর আগে চীনে ঘটে গিয়েছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এর ফলে বেয়ারফুট ডাক্তারদের এই ধরনের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হতো।

গর্ডন লিউ বলছেন, সেই সময়টাতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর বইপত্রের খুবই অভাব ছিল। কারণ লাল চীনের গার্ডরা বেশিরভাগ বই পুড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোন ধরনের লেখাপড়া করা ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার।

কিন্তু কিছু হাতে কলমে প্রশিক্ষণ তিনি পেয়েছিলেন। সে সময়ে গ্রামে কোন পশু চিকিৎসক ছিল না। গর্ডন লিউ বলছিলেন, গ্রাম ছিল অনেক ঘোড়া এবং শুয়োর।

তিনি শুয়োরের ওপর ইনজেকশন দেয়ার প্র্যাকটিস করতেন। এই কাজে হাত পাকানোর পর তিনি তার মানুষ রোগীদের ইনজেকশন দেয়া শুরু করেন।

‘আমার গ্রামের লোকজন গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে তাদের যেসব স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে সেগুলো আমি সহজেই সমাধান করে দিতে পারবো।’


গ্রামীণ ডাক্তার

‘আর সে সময় আমি যদি সেখানে না থাকতাম, কে তাদের দেখা শোনা করতো? কেউ না। এখন যদি আমি সেই গ্রামে গিয়ে বলি আমার কোন মেডিকেল শিক্ষা নেই, কিন্তু আমি আপনাদের চিকিৎসা করবো, তাহলে তারা আমাকে পাগল বলবে।’

কিন্তু ‘বেয়ারফুট ডাক্তাররা’ কী সত্যি সত্যি নগ্নপদ থাকতেন? গর্ডন লিউ বলছেন, ব্যাপারটা মোটেও সেরকম ছিল না। তবে কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে তারা কৃষকদের খামারে গিয়ে সাহায্য করতেন। সে সময় তাদের পায়ের জুতা খুলতে হতো। সে কারণেই তাদের এই নাম।

কীভাবে চলতো এই চিকিৎসা? একটি ঘটনার কথা গর্ডন লিউ-এর খুব মনে আছে।

তার এক আত্মীয়ার দাঁতে একবার খুব ব্যথা শুরু হলো। কিছুতেই ব্যথা কমে না। তিনি চলে গেলেন কাউন্টি হাসপাতালে। সেখান থেকে ফেরার পরও দেখা গেল ব্যথা রয়েই গেছে।

‘এরপর তিনি আমার কাছে এলেন। আমি তার দাঁত পরীক্ষা করলাম। এরপর চীনে ভেষজ ওষুধের যে বই রয়েছে সেটা ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলাম।’

ওই বইতে দাঁতের ব্যথার ওপর যেসব দাওয়াইয়ের কথা বলা হয়েছিল, গর্ডন লিউ তা ভালভাবে পড়লেন। কোন উপকরণ টা সবগুলো ওষুধেই ছিল, এটা লক্ষ্য করে তিনি সেই উপকরণ দিয়ে ওষুধ বানালেন এবং তার আত্মীয়াকে দিলেন।

‘চারদিনের মধ্যেই ব্যথা একেবারে সেরে গেল। এরপর এ নিয়ে গ্রামের মধ্যে শুরু হলো ব্যাপক হৈ চৈ। সবাই বলতে লাগলো ডাক্তার হিসেবে আমি খুবই ভাল। তাদের কথা শুনে সেদিন আমার নিজের ওপর বেশ গর্ব হচ্ছিল।’

গ্রামীণ ডাক্তার কর্মসূচির বিভিন্ন কার্যক্রম চীনে ১৯৫০ সাল থেকেই ছিল। কিন্তু ‘বেয়ারফুট ডাক্তার’ শব্দটা সরকারি দলিলে স্থান পায় ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসে।

তখন সরকারি পত্রিকা রেড ফ্ল্যাগ-এর এক সম্পাদকীয়তে প্রথমবারের মতো শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই কর্মসূচি চলছিল চীনে গ্রামোন্নয়নের অন্যান্য কর্মসূচির পাশাপাশি।

গর্ডন লিউ মনে করেন, একদিক থেকে চিন্তা করলে ‘বেয়ারফুট ডাক্তার’ কর্মসূচিতে অনেক মেধার অপচয় ঘটেছে। সাংস্কৃতিক বিপ্লব অনেক শিক্ষিত চীনাকে গ্রামে কাজ করতে বাধ্য করেছিল। সেটা না করতে হলে এরা অন্যান্য পেশাতে আরো ভাল করতে পারতো বলে তিনি মনে করেন।

চীনে উচ্চশিক্ষার দ্বার আবার খুলে দেয়া হয় ১৯৭৭ সালে। গর্ডন লিউ তৎক্ষণাৎ চাকরি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা করেন।

পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এখন তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের একজন অধ্যাপক। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

বিডি২৪লাইভ/টিএএফ

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: