মেহেরপুর বর্তমান একটি প্রাচীন জনপদ (পর্ব-১)
সোহাগ আরেফিন,
ষ্টাফ রিপোটার :
যে সকল অঞ্চল নিয়ে বর্তমান মেহেরপুর জেলা গঠিত তা একটি প্রাচীন জনপদ। ইতিহাসের সকল স্তরে এই জনপদটি অস্তিত্বশীল ছিল । এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, এর ভৌগলিক অবস্থা এবং অবস্থান বিবেচনা করলে মেহেরপুর যে একটি প্রাচীন জনপদ তা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ অঞ্চলের সকল লোকালয়ই গড়ে উঠেছিল কোন না কোন নদীর তীরে । আর এই নদীগুলির অস্তিত্ব এ অঞ্চলের প্রাচীনতম মানচিত্র তথা টলেমির মানচিত্রে বিদ্যমান।
টলেমির বর্ণনানুসারে অঙ্কিত মানচিত্রে মেহেরপুরের অবস্থান:
Location of Meherpur in a map drawn after Ptolemy’s description
নদী তীরে গড়ে ওঠা এসকল জনপদ হরপ্পা মোহেনজোদারো সভ্যতার সমসাময়িক। এই মন্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যাবে এই জেলার লোকালয়ে প্রাপ্ত পোড়ামাটির তৈরী বিভিন্ন ধরণের সাংসারিক উপকরণ এবং পুতুল তথা মূর্তি । এই মূর্তিগুলোর কোন কোনটি আশ্চর্যজনকভাবে হরপ্পায় প্রাপ্ত মূর্তিগুলোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, বিশেষ করে হাতি ঘোড়া এবং নারী মূর্তিসমুহ গঠণে এবং ভঙ্গিমায় হরপ্পায় প্রাপ্ত নারী মূর্তির অবিকল প্রতিরূপ হিসাবে গণ্য করা যায়।
মেহেরপুরের অন্যতম প্রাচীন বসতি গাংনীর নামটি এ অঞ্চলের প্রাচীনতার ইঙ্গিতবাহী। পেরিপ্লাস ও টলেমির বর্ণনা থেকে জানা যায় আজকের বাংলাদেশ যে ভূভাগ নিয়ে গঠিত তা এক সময়ে (১৫০ খৃষ্টাব্দে) গঙ্গাঋদ্ধি (গ্রীক উচ্চারণে গঙ্গারিড্ডি) নামক একটি সুসংগঠিত ও সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল, তার রাজধানী (অথবা, অন্ততঃ একটি প্রধান নগর) ছিল Gange. তা থেকে (অর্থাৎ গাঙ্গে>গাঙ্গী>গাংনী) গাংনীর নামকরণের সূত্র খোঁজাকে ভিত্তিহীন গণ্য করা যাবে না । নামকরণের এই প্রবণতা থেকে নামটির প্রাচীনত্ব সেই সূত্রে স্থানটির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে। (When Greek historian Periplus talks about India in the first century AD, apparently he speaks of Bangla. He says, "There is a river near it called the Ganges (Ganga)" ... "On its bank is a market town which has the same name as the river, Ganges (Gange, Gamga). (Quote from Sudheer's India's Contribution to the World's Culture located on the Web).গাংনীর নাম করণে গাং বা নদীর সাথে সংযুক্ত থাকাটাই বেশী যুক্তিযুক্ত হলেও নামকরণের রীতিটি যে অনেক প্রাচীন তা মেহেরপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীর অবসথান ও গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। এ জেলার প্রধান নদী ভৈরব অতি প্রাচীন কালের একটি নদী। প্রাগৈতিহাসিক কালে তো বটেই সামপ্রতিক ঐতিহাসিক কালপর্বেও এই নদীটির স্বাভাবিক নাব্যতা বজায় ছিল । নবাব আলীবর্দীখান বাগোয়ান ভ্রমণে এই নদী পথ ব্যবহার করেছিলেন। ভারতের করিমপুর থানার উজানে জলাঙ্গী নদীর সাথে ভৈরবের সংযোগ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে এই নদীর তীরবর্তী জনপদের অস্তিত্ব ও গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা দেয়। মেহেরপুর, গাংনী ও মুজিবনগরের প্রাচীন গ্রামগুলির সবগুলিই কোন না কোন নদী কিংবা নদীর সাথে সংযুক্ত বৃহদায়তন জলাশয় যা বিল বা দহ হিসেবে পরিচিত তার তীরে গড়ে উঠেছে। এসকল গ্রামগুলির মনুষ্যবসতিস্থল বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। অনেক গ্রামের মাটি খনন করলে পোড়ামাটির নানা সাংসারিক উপকরণ মনুষ্য-মূর্তির যে অবশেষাদি পাওয়া যায় সেগুলি নিয়ে কোন গবেষণালব্ধ তথ্য উপাত্ত পাওয়া না গেলেও ঐসকল মূর্তি ও গার্হস্থ্য উপকরণাদির গঠণ থেকে এবং বিশেষতঃ হরপ্পা-মোহেঞ্জারোতে প্রাপ্ত মনুষ্য-মূর্তির সাথে তাদের সাদৃশ্য থেকে এ ধারণা করা যায় যে সেগুলি এবং সেই সূত্রে তাদের উৎসস্থলগুলি অনেক প্রাচীন।
বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। খৃষ্টপূর্বকালেও বাংলার অস্তিত্ব ছিল ভিন্ন নামে ভিন্ন অবয়বে। প্রাচীনযুগের ইতিহাসের কোন প্রামাণ্য সূত্র ঐতিহাসিকদের হাতে না থাকায় তারা ইতিহাসবহির্ভূত বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাচীন ইতিহাসের কাঠামো নির্মানের চেষ্টা চালিয়েছেন। এদেশে আগত বিদেশি পর্যটক, পরিব্রাজক, অভিযাত্রীগণের বর্ণনা, লোককাহিনী, মহাকাব্য ও অন্যান্য ধর্মীয় শাস্ত্রাদি এবং পুরাণ ইত্যাদির সহায়তায় প্রাচীন বাংলার একটি অনুমান নির্ভর ঐতিহাসিক কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়। যে সকল অঞ্চল নিয়ে আজকের বাংলাদেশ গঠিত, সেগুলি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন নামে পরিচিত ভূখণ্ডের অন্তর্ভূক্ত ছিল। এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক অস্তিত্বের সাথে যে সকল ঐতিহাসিক সত্তা জড়িত সে গুলো হলো, গঙ্গাঋদ্ধি বা গঙ্গারিড্ডি, বঙ্গ, সমতট, বরেন্দ্র, পুন্ড্রবর্ধন, রাঢ়, গৌড়, তাম্রলিপ্তি, কর্ণসুবর্ণ, হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ ইত্যাদি। এই সকল Historical entityগুলোর কোনটিরই ইতিহাসের কোন পর্বেই Exclusive existence বা নিরঙ্কুশ সত্তা ছিল না। একটি ঐতিহাসিক অস্তিত্ব আরেকটি ঐতিহাসিক অস্তিত্বের সূত্র বা পরিণতি হওয়ার মতো সরল গতিতে এ অঞ্চলের ইতিহাস পরিচালিত হয়নি। ফলে প্রাচীন বাংলার ঘটনা প্রবাহকে ইতিহাসের শৃংখলে আবদ্ধ করা এক কঠিণ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীন বাংলার সামগ্রীক ইতিহাসের এ রকম অবস্থার প্রেক্ষিতে মেহেরপুরের মতো একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল বিশেষের প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধান সহজসাধ্য বিষয় নয়। মেহেরপুরের ইতিহাস বিষয়ে উলেখযোগ্য কোন গবেষণাকর্ম পরিচালিত না হওয়ায় এর ইতিহাস অনুসন্ধানের কোন সূত্রও পাওয়া যায় না।
চলবে......
বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬৭৮৬৭৭১৯১
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬৭৮৬৭৭১৯০
মার্কেটিং ও সেলসঃ ০৯৬১১১২০৬১২
ইমেইলঃ [email protected]





পাঠকের মন্তব্য: