ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দেশত্যাগের গুঞ্জন ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও পশ্চিমা গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, খামেনি নাকি দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এই দাবি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খামেনির পালানোর খবর ভিত্তিহীন গুজব ছাড়া কিছুই নয়।
পশ্চিমা ও ভারতীয় গণমাধ্যমের দাবি
রোববার (১১ জানুয়ারি) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভ পরিস্থিতি আরও জটিল হলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (৮৬) পরিবারের প্রায় ২০ জন সদস্যকে নিয়ে দেশত্যাগ করতে পারেন—এমন দাবি উঠেছে আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যমে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনী সরকারের নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানালে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর নামও আলোচনায় আসে।
ইরানি দূতাবাসের কড়া প্রতিক্রিয়া
তবে ভারতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস এক বিবৃতিতে এসব খবরকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও গুজব” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। দূতাবাস জানায়, ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও খামেনি দেশ ছাড়েননি। সুতরাং চলমান বিক্ষোভের কারণে তার দেশত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না। এসব সংবাদকে শত্রু রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বলেও উল্লেখ করা হয়।
অর্থনৈতিক সংকটে বিক্ষোভ জোরদার
এদিকে ইরানের বিভিন্ন শহরে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়েছে। বহু এলাকায় দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি তুলছেন।
সরকারপন্থি সমাবেশও অব্যাহত
বিক্ষোভের পাশাপাশি কেরমানসহ বিভিন্ন শহরে সরকারপন্থি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব সমাবেশে হাজারো মানুষ আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটিতে মতভেদ গভীর হলেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
ইন্টারনেট বন্ধে পশ্চিমা গণমাধ্যমের অভিযোগ
এই পরিস্থিতির মধ্যেই দেশজুড়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর দাবি, তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করে নিরাপত্তা বাহিনীর কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর আড়াল করতেই এই ‘ইন্টারনেট কিল সুইচ’ চালু করা হয়েছে।
নেটব্লকসের তথ্য: ২ শতাংশের নিচে নেমেছে সংযোগ
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলপ টোকার ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, “এটি ডিজিটাল উপায়ে নিজের জনগণের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধ।” তাঁর দাবি, বিক্ষোভের ১৩তম দিনে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় ২ শতাংশেরও নিচে নেমে আসে।
ব্যাংকিং ও জরুরি সেবায় মারাত্মক প্রভাব
নেটব্লকস জানায়, ধাপে ধাপে নেওয়া এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত পুরো দেশকে কার্যত ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এর ফলে শুধু মোবাইল বা কম্পিউটার নয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, জরুরি সেবা ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
নিহত ও গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে অন্তত ৬৫ জন নিহত হয়েছেন এবং দুই হাজার ৩০০–এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান’ জানিয়েছে, অন্তত ১৮০টি শহরে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই বিক্ষোভকারী।
অ্যামনেস্টির অভিযোগ ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে, নিরাপত্তা বাহিনী বেআইনিভাবে গুলি চালানো, গ্রেপ্তার ও মারধরের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের তুলনায় এবারের ইন্টারনেট বন্ধ আরও কঠোর, যা ইঙ্গিত দেয়—তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় ইরানি সরকার সর্বোচ্চ মাত্রার নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর