দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নবম জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে–স্কেল, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসাভাতা, টিফিন ভাতা, পেনশন সংস্কার ও কল্যাণমূলক নানা সুবিধাসহ একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের কমিশন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই কমিশন তাদের কাজ শেষ করেছে। কমিশন গঠিত হয় গত বছরের ২৭ জুলাই এবং প্রতিবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
১২ বছর পর নতুন বেতন কমিশন
২০১৩ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর নবম কমিশন গঠিত হলো। এই সময়ে দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান বেতন কাঠামো দিয়ে সরকারি কর্মচারীদের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০ গ্রেড অপরিবর্তিত, বেতন বাড়ছে বড় পরিসরে
সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে কমিশন বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করেছে। তবে প্রতিটি গ্রেডেই বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সুপারিশ অনুযায়ী—
সর্বনিম্ন বেতন- বর্তমান: ৮,২৫০ টাকা, প্রস্তাবিত: ২০,০০০ টাকা।
সর্বোচ্চ বেতন- বর্তমান: ৭৮,০০০ টাকা, প্রস্তাবিত: ১,৬০,০০০ টাকা।
বাড়ি ভাড়া ভাতা: বড় শহরে বেশি সুবিধা
কমিশনের প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়া ভাতা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী- ঢাকা ও বড় মহানগর এলাকায় কর্মরতদের জন্য বাড়ি ভাড়া ভাতা বেতনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণের সুপারিশ। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরতদের জন্য অঞ্চলভেদে ৩০–৪৫ শতাংশ ভাতা। সরকারি আবাসনের অপ্রতুলতা বিবেচনায় বাড়ি ভাড়া ভাতা নিয়মিত পর্যালোচনার প্রস্তাব।
চিকিৎসাভাতা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা
চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কমিশন চিকিৎসাভাতা ও স্বাস্থ্যবীমা চালুর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে— মাসিক চিকিৎসাভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু। কর্মরত অবস্থায় ও অবসরের পরও সীমিত আকারে চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত। পরিবার–নির্ভর চিকিৎসা সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব।
টিফিন ভাতা ও অন্যান্য ভাতা
নবম কমিশনের প্রতিবেদনে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় টিফিন ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে- বর্তমান: ২০০ টাকা, প্রস্তাবিত: ১,০০০ টাকা।
এছাড়া—
উৎসব ভাতা পুনর্মূল্যায়ন
যাতায়াত ও শ্রান্তি ভাতা পর্যালোচনা
দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কর্মরতদের জন্য বিশেষ ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব
প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে কমিশন একটি নতুন ভাতা প্রস্তাব করেছে।
কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে
প্রতি সন্তান মাসিক ২,০০০ টাকা ভাতা
সর্বোচ্চ দুইজন সন্তান এই সুবিধার আওতায় আসবে
পেনশন সংস্কার ও কল্যাণমূলক প্রস্তাব
কমিশনের প্রতিবেদনে পেনশন ব্যবস্থার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—
পেনশন কাঠামোর আধুনিকীকরণ
সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন
আলাদা সার্ভিস কমিশন গঠন
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন
বাস্তবায়নে ব্যয় ও চ্যালেঞ্জ
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে— ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৯ লাখ পেনশনভোগী, এই খাতে বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
মতামত গ্রহণ ও গবেষণা
প্রতিবেদন তৈরিতে কমিশন— ১৮৪টি সভা করেছে, ২,৫৫২ জন অংশীজনের মতামত নিয়েছে, বিভিন্ন ক্যাডার, কর্মচারী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
প্রতিবেদন গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “মানুষ বহুদিন ধরে একটি বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় ছিল। কমিশনের প্রস্তাবগুলো সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন।” অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, “প্রতিবেদন বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কমিটি গঠন করা হবে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি দেখা হবে।”
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর