কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে এখন চোখ তুললেই দেখা যায় নীল আকাশে উড়ছে রঙিন সব প্যারাশুট। বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে স্পিডবোটের টানে ভেসে বেড়াচ্ছেন পর্যটকেরা। দৃশ্যটি শুধু সৌন্দর্যই নয়, জানান দিচ্ছে কক্সবাজারের পর্যটন চিত্র বদলে যাওয়ার গল্প।
এক সময় যেখানে সৈকত মানেই ছিল হাঁটা, সূর্যাস্ত দেখা আর সমুদ্রে নামা, সেখানে এখন জায়গা করে নিচ্ছে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম। তার অন্যতম আকর্ষণ প্যারাসেইলিং। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে প্যারাসেইলিং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ আকাশে ভেসে থাকতে থাকতে একসাথে দেখা যায় সমুদ্র, দীর্ঘ বালুকাবেলা, হোটেল-রিসোর্ট আর দূরের পাহাড়ের বিস্তৃত দৃশ্য। অনেক পর্যটকের কাছে এটি জীবনের একবারের অভিজ্ঞতা। আবার কারও কাছে কক্সবাজার ভ্রমণের মূল আকর্ষণই হয়ে উঠেছে এই রোমাঞ্চ।
প্যারাসেইলিং মূলত একটি জলভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার খেলা। অংশগ্রহণকারীকে বিশেষ বেল্ট ও হারনেস দিয়ে প্যারাশুটের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর একটি শক্তিশালী স্পিডবোট সেটিকে টেনে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পর্যটক উঠে যান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে। নিচে নীল জলরাশি, ওপরে খোলা আকাশ। ব্যবসায়ীরা এটিকে একইসাথে নিরাপদ, রোমাঞ্চকর ও প্রশান্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে প্রচার করেন।
তবে এই রোমাঞ্চের আড়ালেই রয়েছে ঝুঁকি। সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা সেই বাস্তবতাই সামনে এনে দিয়েছে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে দরিয়া নগরের কাছে একটি প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় এক পর্যটক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সৈকতের ঝাউ গাছে আটকে পড়েন। সৌভাগ্যক্রমে তিনি গুরুতর আহত হননি। কিন্তু ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। এর পরই জেলা প্রশাসন মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশের সৈকতে প্যারাসেইলিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেয়। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নির্দেশনা অমান্য করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালে এক নারী পর্যটক প্যারাসেইলিং করার সময় আহত হন। ওই ঘটনার পর কক্সবাজারের একটি আদালত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে তলব করে। নিরাপত্তা সরঞ্জামের মান, জনবল ও প্রস্তুতির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, পর্যাপ্ত তদারকি ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ ছাড়া এই খেলা কতটা নিরাপদ। তবুও প্যারাসেইলিংয়ের আকর্ষণ কমেনি। অনেক পর্যটক ঝুঁকির কথা জানেন, ভয়ও পান, কিন্তু রোমাঞ্চ তাদের টেনে নেয়।
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক ইশিতা সম্প্রতি কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং করেছেন। তিনি বলেন, আকাশে উড়ার অনুভূতিটা দারুণ ছিল। কিন্তু পা যখন সমুদ্রের পানি ছুঁয়ে যাচ্ছিল, তখন খুব ভয় লাগছিল। মনে হচ্ছিল, যদি পড়ে যাই। সৈকতে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখছিলেন তার স্বামী মইন উদ্দিন। স্ত্রীর বহুদিনের শখ পূরণ হতে দেখে তিনি আনন্দিত, তবে ভেতরে ভেতরে দুশ্চিন্তাও ছিল বলে জানান।
প্যারাসেইলিং ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই খাতটি কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস’-এর মালিক ফরিদুল আলম জানান, বর্তমানে জেলায় পাঁচটি সক্রিয় প্যারাসেইলিং পয়েন্ট রয়েছে। কখনও কখনও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা আসে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে পর্যটকদের আগ্রহ কমেনি।
তিনি বলেন, সঠিক নিয়মকানুন থাকলে এই খাত আরও বড় পরিসরে গড়ে তোলা সম্ভব।
এই চিত্র শুধু কক্সবাজারের নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র যেমন থাইল্যান্ডের পাতায়া কিংবা ভিয়েতনামের দা নাংয়েও প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। সেসব ঘটনার পর ওই দেশগুলোতে নিরাপত্তা বিধি আরও কঠোর করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতির মান এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারেও এখন একই প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্যারাসেইলিংয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সঠিক তদারকি, স্পষ্ট নীতিমালা এবং দায়িত্বশীল পরিচালনার ওপর। সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই স্বীকার করছেন, দুর্ঘটনা এড়াতে আরও উন্নত প্রশিক্ষণ, মানসম্মত সরঞ্জাম এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি।
প্যারাসেইলিং কক্সবাজারের পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে, বাড়াচ্ছে পর্যটকদের আকর্ষণ। তবে সেই রোমাঞ্চ যেন ভয় হয়ে না ওঠে, সে জন্য নিরাপত্তার সঙ্গে এই প্রসারের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর