ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার আগে, ওয়াশিংটন ও কারাকাসের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একটি গোপন সমঝোতা হয়েছিল। মাদুরোর ঘনিষ্ঠ ডেলসি রদ্রিগেজ এবং তার ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, মাদুরো বিদায় নিলে তারা সহযোগিতা করবেন। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান, যেটি উচ্চপর্যায়ের চারটি সূত্রের বরাত দিয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, ডেলসি ও হোর্হে রদ্রিগেজ গোপন মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, মাদুরো পদত্যাগ করলে তারা তা স্বাগত জানাবেন। ডেলসি রদ্রিগেজ যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন থেকেই মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয়। গত শরৎকাল থেকে এই আলোচনার ধারা চলছিল, এবং নভেম্বরের শেষ দিকে ট্রাম্প ও মাদুরোর গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের পর এটি আরও জোরালো হয়। ওই ফোনালাপে ট্রাম্প মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা ছাড়ার নির্দেশ দেন, যা মাদুরো প্রত্যাখ্যান করেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ডেলসি রদ্রিগেজ তখন বলেছেন, “মাদুরোর চলে যাওয়া দরকার,” এবং তিনি প্রস্তুত আছেন “পরবর্তী সময়ে যা হবে তাতে কাজ করার জন্য।” শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরকারপক্ষের লোকজনের সঙ্গে কাজ করতে অনাগ্রহী ছিলেন, তবে পরে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, মাদুরোর বিদায়ের পর অরাজকতা রোধে ডেলসি রদ্রিগেজই সবচেয়ে কার্যকর ব্যক্তি।
মাদুরোকে আটক করার আগে ডেলসি ও হোর্হে রদ্রিগেজ যে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা আগে প্রকাশ হয়নি। কাতারের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় ডেলসি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, মাদুরো পদত্যাগ করলে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হবেন। তবে ওই আলোচনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। রয়টার্স জানায়, ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোও মাদুরো অভিযানের কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ছিলেন।
সূত্রগুলো বলছে, ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে সমঝোতার সূক্ষ্ম সীমারেখা ছিল: মাদুরো বিদায় নিলে তিনি সহযোগিতা করবেন, তবে সরাসরি তাকে সরানোর জন্য সক্রিয় প্রতিশ্রুতি দেননি। অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, ডেলসি রদ্রিগেজ এই উদ্যোগে “সমর্থন দিয়েছেন” এবং “সব বোঝেন।”
ভেনেজুয়েলা সরকার এবং হোয়াইট হাউস গার্ডিয়ানের বিস্তারিত প্রশ্নের কোনও জবাব দেননি। তবে গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, এই গোপন আলোচনার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন ও মাদুরো সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনাও চলছিল। ট্রাম্পের অভিষেকের মাত্র ১০ দিন পর, মাদুরো তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রিক গ্রেনেলের সঙ্গে মার্কিন বন্দিদের বিষয়ে আলোচনার জন্য সাক্ষাৎ করেন, এবং পরে কয়েকজন বন্দি মুক্তি পান।
সূত্র জানায়, ট্রাম্পের শীর্ষ সহকারীরা নিয়মিত ডেলসি ও হোর্হে রদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলতেন— বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত ভেনেজুয়েলানদের প্রতি দুই সপ্তাহে ফ্লাইট চালানো, এল সালভাদরে আটক ভেনেজুয়েলানদের অবস্থা এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি নিয়ে সমন্বয়ের জন্য।
এদিকে কাতারের সঙ্গে ডেলসি রদ্রিগেজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। কাতারের শাসক পরিবারের সদস্যরা তাকে বন্ধু হিসেবে দেখতেন বলে সূত্র জানিয়েছে। কাতার সম্প্রতি ট্রাম্পকে ব্যবহারের জন্য ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিলাসবহুল বিমান উপহার দেয়। কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেয়া নজিরবিহীন উপহার এটি। এই সৌহার্দ্য কাজে লাগিয়েই গোপন আলোচনায় ডেলসির জন্য আরও দরজা খুলে দেয় কাতার।
গত বছরের অক্টোবরে মায়ামি হেরাল্ড জানায়, ডেলসি প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে মাদুরো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার মাধ্যমে অবসর নিলে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেবেন। সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং ডেলসি সংবাদটিকে তীব্র ভাষায় অস্বীকার করেন। তবে অনেক মার্কিন কর্মকর্তা তখন বুঝতে শুরু করেন, তিনি কট্টর মতাদর্শিক নেত্রী নন। যারা তাকে কাছ থেকে চেনেন, তারা বলেন, তার কিছু ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সহজেই মানুষকে কাছে টানে। তিনি শ্যাম্পেন পান করেন, ব্যক্তিগত টেবিল টেনিস কোচ রাখেন এবং বিদেশি কূটনীতিকদের খেলায় চ্যালেঞ্জ করতে পছন্দ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল, মাদুরোর বিদায়ের পর যেন দেশটি অস্থিতিশীলতা বা গৃহযুদ্ধের দিকে না যায়। একটি সূত্র বলছে, ‘সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া ঠেকানো’। এরপর শরতের শেষ দিকে গিয়েই ডেলসি ও তার ভাই মাদুরোর অজান্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন আলোচনায় বসেন। এরপর নভেম্বর মাসে মাদুরো ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং পরের সপ্তাহেই স্পষ্ট হয়— তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না।
অবশ্য ডেলসি রদ্রিগেজের জন্য বিষয়টি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে মাদুরোকে উৎখাতের প্রস্তাব দিচ্ছিলেন, অন্যদিকে মাদুরোর সঙ্গে প্রকাশ্যে বিশ্বাসঘাতকতা করতেও রাজি হননি। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি মাদুরোকে ভয় পেতেন’।
এরপর চলতি জানুয়ারি মাসের শুরুতে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার কারাকাসে ঢোকে, তখন ডেলসি রদ্রিগেজকে কোথাও দেখা যায়নি। একপর্যায়ে গুজব ছড়ায়, তিনি মস্কোতে পালিয়ে গেছেন। তবে দুই সূত্র জানায়, তিনি তখন ভেনেজুয়েলার পর্যটন দ্বীপ মার্গারিটায় ছিলেন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর