• ঢাকা
  • ঢাকা, শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:৪৬ সকাল

কক্সবাজারের 'হেজালা' হয়ে উঠছে সুপারফুড ও সম্ভাবনার দিগন্ত

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

কক্সবাজারের নীল সমুদ্র আর লবণাক্ত বাতাসের ভেতর নীরবে গড়ে উঠছে এক নতুন সম্ভাবনার গল্প। যে উপাদান একসময় উপকূলের মানুষের কাছে ছিল প্রায় অচেনা, কখনওবা অবহেলিত, সেটিই এখন পুষ্টি, শিল্প আর বিকল্প অর্থনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে নতুন নাম নিয়ে- সামুদ্রিক শৈবাল। স্থানীয়দের মুখে যার নাম ‘হেজালা’।

সামুদ্রিক শৈবাল সাধারণত পাথর, বালি, পরিত্যক্ত জাল, ঝিনুকের খোলস বা অন্য কোনো শক্ত অবকাঠামোর গায়ে জন্মায়। কক্সবাজার উপকূলে মূলত তিন ধরনের শৈবাল পাওয়া যায়- লাল, বাদামি ও সবুজ। এর মধ্যে সবুজ ও বাদামি শৈবাল সরাসরি খাদ্য হিসেবে ব্যবহারযোগ্য, আর লাল ও বাদামি শৈবাল থেকে তৈরি হয় হাইড্রোকলয়েড, যা খাদ্যশিল্প থেকে শুরু করে প্রসাধনী, ওষুধ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহৃত হয়।

একসময় উপকূলের অনেক মানুষের কাছেই শৈবাল ছিল অচেনা। কিন্তু রাখাইন জনগোষ্ঠীর কাছে ‘হেজালা’ বহু পুরোনো এক খাবার। চরাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা শৈবাল দিয়ে তারা ঘরে ঘরে রান্না করত নানা পদ। সেই ঐতিহ্য এখন আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোয় নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে।

শৈবালে রয়েছে উচ্চমাত্রার আয়োডিন, যা থাইরয়েড হরমোনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ দুধের তুলনায় বহু গুণ বেশি বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা, এবং এটি তুলনামূলক সহজপাচ্য। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ হওয়ায় একে অনেকেই এখন সুপারফুড হিসেবেও উল্লেখ করছেন।

খুরুশকুলের বাসিন্দা কে মং রাখাইন বলেন, তাদের পূর্বপুরুষেরা প্রকৃতির নানা উপাদানকেই খাদ্য ও ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতেন। ‘হেজালা’ও তেমনই একটি উপাদান। আগে যা ছিল গ্রামীণ খাবার, এখন সেটিই সি-উইড নামে শহুরে বাজারে মূল্য পাচ্ছে।

বাংলাদেশে সামুদ্রিক শৈবাল নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা শুরু হয়েছে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) ন্যাশনাল কনসালটেন্ট এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকুয়াকালচার ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এ এম সাহাবউদ্দিন জানান, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শৈবাল চাষ বহুদিনের হলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে আগে তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না।

মৎস্য বিভাগ, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ২০১০ সালের পর থেকে শৈবাল চাষ নিয়ে কাজ শুরু করে। ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ১০টি প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। এখন উৎপাদন কৌশল, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবহার—সব ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে।

কক্সবাজার মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ কয়েকটি গবেষণাগারে শৈবালের বীজ উৎপাদনের কাজ চলছে। এসব বীজ উপকূলের কৃষকদের মধ্যে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে পরিকল্পিতভাবে চাষ বাড়ানো যায়।

বাংলাদেশ মেরিন ফিসারিজ অ্যাসোসিয়েশনের ইনানী এলাকার শৈবাল চাষ প্রকল্পের পরিচালক মো. শিমুল ভূঁইয়া মনে করেন, দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও দীর্ঘ উপকূলরেখা সি-উইড চাষের জন্য উপযুক্ত। তার ভাষায়, কিছু প্রজাতির শৈবাল থেকে ভবিষ্যতে বায়োফুয়েল, বায়ো-ইথানল, বায়ো-হাইড্রোকার্বন এমনকি বায়ো-হাইড্রোজেন উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, বাণিজ্যিকভাবে শৈবাল চাষ ছড়িয়ে পড়লে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দুয়ার খুলতে পারে।

নব্বইয়ের দশক থেকে পথচলা নারী উদ্যোক্তাদের:

সামুদ্রিক শৈবাল চাষে কক্সবাজারে নারীদের অংশগ্রহণও ধীরে ধীরে বাড়ছে। উদ্যোক্তা জাহানারা ইসলাম জানান, নব্বইয়ের দশকেই তিনি শৈবালের সম্ভাবনা দেখে চাষে যুক্ত হন। পরে নুনিয়ারছড়ার কিছু মানুষকে তিনি এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। ২০০৮-০৯ সালের দিকে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সীমিত সহায়তায় শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক চাষ।

এখন তিনি শৈবাল দিয়ে ১২৭ ধরনের পণ্য তৈরি করছেন বলে জানান। কাঁচা শৈবাল চাষিরা প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি করেন, আর শুকনা শৈবালের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে অনেক চাষি বছরে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।

এই খাতে নারীরা ঘরে বসেই প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুকানো, গুঁড়া তৈরি, প্যাকেটজাত করা- এসব কাজে যুক্ত হতে পারছেন, যা উপকূলের নারীদের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।

রেস্টুরেন্ট থেকে শৈবাল খামার, মারিয়া রে’র গল্প:

কক্সবাজারে সামুদ্রিক শৈবাল নিয়ে আলোচনায় এখন একটি পরিচিত নাম মারিয়া রে। তার উদ্যোক্তা জীবন শুরু হয়েছিল রান্না দিয়ে, আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তিনি ঢুকে পড়েন সি-উইড বা সামুদ্রিক শৈবালের জগতে।

ঢাকায় ২০০৮ সালে একটি কলসেন্টারে ১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন মারিয়া। কিন্তু ব্যবসার প্রতি আগ্রহ ছিল শুরু থেকেই। চাকরির পাশাপাশি বিউটি পারলার ও পোশাকের ছোট ব্যবসা করতেন। পরে একটি অ্যান্টিভাইরাস কোম্পানিতে বিপণন ব্যবস্থাপক হিসেবেও কাজ করেন। ২০১৮ সালে বিয়ের পর স্বামীর চাকরির সুবাদে চলে আসেন কক্সবাজারে।

ছোটবেলা থেকেই রান্নার প্রতি টান ছিল, কারণ তার বাবা ছিলেন একজন রন্ধনশিল্পী। অবসরে নতুন নতুন রেসিপি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। ২০১৯ সালে অনলাইনে ক্লাউড কিচেন চালু করেন। এরপর ২০২২ সালে লাবণী বিচ পয়েন্টে স্টারিনাস কিচেন নামে রেস্টুরেন্ট খোলেন। পর্যটন মৌসুমে মাসে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ব্যবসা হয় তার রেস্টুরেন্টে।

সেই সময়ই বিদেশ থেকে শুকনা সামুদ্রিক শৈবাল হাতে পান তিনি। ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, শৈবাল দিয়ে স্যুপসহ নানা খাবার তৈরি হয়। পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানার পর আগ্রহ আরও বাড়ে। তিনি রেস্টুরেন্টের মেন্যুতে শৈবাল দিয়ে তৈরি স্যুপ ও অন্যান্য পদ যুক্ত করেন, আর ভালো সাড়া পেতে শুরু করেন পর্যটকদের কাছ থেকে।

এরপর স্থানীয়ভাবে শৈবাল সংগ্রহ করে তা শুকিয়ে গুঁড়া বানানো, সাবান তৈরি- এসব পণ্যের উৎপাদন শুরু করেন মারিয়া। ২০২৫ সালে শৈবালভিত্তিক পণ্য বিক্রি করে প্রায় দুই লাখ টাকার ব্যবসা করেন তিনি।

বাজারে চাহিদা বাড়তে থাকায় গত নভেম্বরে নুনিয়াছটা এলাকায় নিজেই প্রায় দেড় একর জায়গায় সামুদ্রিক শৈবাল চাষ শুরু করেন মারিয়া রে। তিনি উলভা ও গ্র্যাসেলেরিয়া- এই দুই ধরনের শৈবাল চাষ করছেন। গ্র্যাসেলেরিয়া শীতকালে উপকূলে স্বাভাবিকভাবে জন্মায়, সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়। আর উলভা শৈবালের বীজ সংগ্রহ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে। তাঁর খামারে ছয়টি জেলে পরিবারের নারী সদস্য কাজ করছেন।

সামুদ্রিক শৈবাল চাষে লবণাক্ততা, পানির গুণগত মান ও আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মৌসুমে চাষ করা হয়। এক মাস পরপর শৈবাল সংগ্রহ করা যায়। চলতি মৌসুমে প্রায় ২৪ টন উলভা উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে মারিয়ার। সেখান থেকে প্রায় দুই টন শুকনা শৈবাল পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ৫০০ কেজি গ্র্যাসেলেরিয়া উৎপাদনের আশা করছেন তিনি। সব মিলিয়ে এ বছর প্রায় ৩০ লাখ টাকার শৈবাল বিক্রির লক্ষ্য তার। বর্তমানে তিনি সি ফরেস্ট বিডি নামে অনলাইনে শৈবাল ও শৈবালজাত পণ্য বিক্রি করছেন।

মারিয়া রে বলেন, শৈবালে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-এজিং উপাদান, ভিটামিন ও খনিজ থাকায় এটি পুষ্টিকর খাদ্য। শিশুদের আয়োডিন ঘাটতি পূরণে এবং নারীদের পুষ্টি চাহিদা মেটাতেও এটি সহায়ক হতে পারে। কাঁচা, শুকনা, গুঁড়া বা নির্যাস- বিভিন্নভাবে এটি ব্যবহার করা যায়।

শুধু খাদ্য নয়, শৈবাল এখন জৈব সার, পশুখাদ্য, প্রসাধনী এবং ওষুধ শিল্পেও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্য তৈরির ক্ষেত্রেও শৈবাল সম্ভাবনাময়।

মারিয়া জানান, রাখাইন সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশে তিনি স্থানীয়ভাবে শৈবাল রান্নার বিভিন্ন পদ্ধতি শিখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বাঙালি খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানানসই করে উলভা শৈবাল দিয়ে পাকোড়া, স্যুপসহ ফিউশন খাবার তৈরি করেন।

উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পথচলায় প্রশিক্ষণের ভূমিকাও উল্লেখ করেন মারিয়া। ব্র্যাক ব্যাংকের আমরাই তারা উদ্যোগের আওতায় বিপণনবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি বাজার সম্প্রসারণে আত্মবিশ্বাস পেয়েছেন। এখন তিনি শৈবালভিত্তিক পণ্যকে বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান।

কক্সবাজার উপকূলে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ তাই শুধু একটি কৃষিকাজ নয়, ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠছে পুষ্টি, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, উপকূলীয় অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পের মিলিত এক নতুন ক্ষেত্র। যে ‘হেজালা’ একসময় ছিল কেবল উপকূলের মানুষের পরিচিত, সেটিই এখন সম্ভাবনার সবুজ সীমানা ছড়িয়ে দিচ্ছে সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।

সাজু/নিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]