মাত্র ১৯টি মাছধরা নৌযানের নিলাম দেখিয়েছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু। কাগজে-কলমে ১৯টি নৌযানের তথ্য লিপিবদ্ধ থাকলেও সরজমিন অনুসন্ধানে ৬২টি নৌযান নিলামে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তিনি ৪৩টি নৌযান নিলামে বিক্রির তথ্য গোপন করে মোটা অংকের টাকা গায়েব করেছেন। গত তিন মাসের অনুসন্ধানে ২২ দিনের ‘মা’ ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের গোপন দুর্নীতির এসব তথ্যের খোঁজ মিলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীতে অভিযান পরিচালনা করার জন্য দুলারহাট থানার বাংলাবাজার এলাকার সবুজ মাঝির ট্রলার ব্যবহার করে ৩০টি ও পাঁচ কপাট মৎস্যঘাটের আঃ রহমান মাঝির ট্রলার ব্যবহার করে ২১টি নৌযান আটক করে নিলামে বিক্রি করেছেন। এছাড়াও নিলাম ফরমে ১১টি নৌযানের তথ্য উল্লেখ থাকলেও ৮টি নিলাম ফরমে ওই কর্মর্তার স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।
তেতুলিয়া নদী সংলগ্ন বাংলাবাজার এলাকার সবুজ মাঝি ও পাঁচ কপাট মৎস্যঘাটের আঃ রহমান মাঝির সাথে কৌশলী কথোপকথনে আরও বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। সবুজ মাঝির ভাষায়, ‘২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আমার হাতে ব্যাপক নৌকা ছিল। বাংলাবাজার মৎস্যঘাটে ৩০টার মতো নৌকা প্রকাশ্যে নিলাম দিয়েছে চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য অফিস। আকারভেদে একেকটা নৌকা ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা করে নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। তবে যার যার নৌকা সে সে নিয়েছে।’
মেঘনা নদীতে আটককৃত নৌযানগুলোর নিলামের পুরো প্রক্রিয়ার বিষয়ে পাঁচ কপাট মৎস্যঘাটের মাঝি আঃ রহমান বলেন, ‘মেঘনা নদীতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলমান সময়ে উপজেলা মৎস্য অফিসার জয়ন্ত কুমার অপু পাঁচ কপাট মৎস্যঘাটে ১৬টি ও ফিসারিজ মৎস্যঘাটে ৫টি নৌকা নিলাম দিয়েছিল। তবে নিলামে যার নৌকা সেই নিয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করা শর্তে ফিসারিজ মৎস্যঘাটের এক জেলে বলেন, ‘আমি এই মৎস্যঘাটের একজন জেলে। ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আমাদের ঘাটে আটককৃত ৫টি নৌকা মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে নিলাম ছাড়া নিয়ে এসেছি।’
এদিকে কাগজে-কলমে ৬২টি নৌযান নিলামের বিষয় উল্লেখ না থাকলেও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন এর স্বাক্ষরিত উপজেলা ভিত্তিক একটি চুড়ান্ত প্রতিবেদনে চরফ্যাশন উপজেলায় ১৪টি ট্রলার ও ৫টি নৌকা উল্লেখ রয়েছে এবং যার নিলামকৃত মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা।
সবুজ মাঝি , আঃ রহমান মাঝি ও নিলাম বিক্রির ফরম থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ৬২টি নৌযান যদি গড়ে ১০ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি হয়, তাতে এর মূল্য আসে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের চুড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত নৌযানের নিলাম মূল্য ১ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা বাদ দিলে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা অবশিষ্ট থাকে।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, নদীতে অভিযান পরিচালনা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। মা ইলিশ রক্ষায় নামমাত্র অভিযান আমজনতাকে দেখালেও এ দৃশ্যের পেছনে ছিল তার অবৈধ আয়। তার এই অনিয়মের আদ্যপ্রান্ত সম্পর্কেও উপজেলার পাঁচ কপাট, সামরাজ, নতুন স্লুইসগেট, বাংলাজার, গাছিরখাল, চৌকিদারখাল ও ফিসারিজ মৎস্যঘাটের কয়েকজন জেলে জানিয়েছেন।
চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, এই উপজেলায় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ১৩৫টি, মৎস্যঘাট ২১৯টি, আড়ত সংখ্যা ৫০৯টি রয়েছে। বড় মৎস্যঘাটগুলোর মধ্যে সামরাজ, নতুন স্লুইসগেট, খেজুরগাছিয়া, মাইনউদ্দি ঘাট, ঢালচর, বকসীরঘাট, ঘোষেরহাট, চরকচ্ছপিয়া ও কুকরি মুকরি অন্যতম। উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছে। নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২৮১জন। অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার। এসব জেলেরা নদী ও সাগরে মাছ শিকার করে। এ অঞ্চলে প্রায় ১২ হাজার ট্রলার ও নৌকা রয়েছে। এছাড়াও গভীর সমুদ্রগামী ৭ হাজার ট্রলার রয়েছে।
উল্লেখ্য, ইলিশের প্রজনন রক্ষায় ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের জন্য দেশের সব নদী ও সাগরে ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন ও মজুত নিষিদ্ধ করেছিলো সরকার। এ লক্ষ্যে চরফ্যাশন উপজেলার মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান পরিচালনা করেছেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু।
৬২টি নৌযানের মধ্যে ৪৩টি নৌযান নিলাম গোপন রাখার বিষয়ে জানতে রোববার বেলা আড়াইটায় উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপুর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি না ধরায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য অফিস যে তথ্য দিয়েছে, আমরা সেই তথ্যই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছি। তবে অনিয়মের বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর