মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার হুমকির মধ্যেই যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতির বার্তা দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সামরিক ‘নৌবহর’ ইরানের জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান নেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। তবে একই সঙ্গে সংঘাত এড়াতে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার তুরস্কে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন। এই সফরের উদ্দেশ্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা এবং চলমান উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করা।
বাঘাই বলেন, “ইরান অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায়।” এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন আঞ্চলিক নেতারা যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক হামলা থেকে বিরত রাখতে এবং উভয় পক্ষকে কোনো না কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তবে এসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যাকে ‘আর্মাডা’ বা বিশাল নৌবহর বলে উল্লেখ করেছেন, সেই সামরিক শক্তি ইরানের জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। এ বহরের নেতৃত্বে রয়েছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী।
এর জবাবে ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় শীর্ষ মহল থেকে একের পর এক কঠোর বার্তা আসছে। তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বর্তমান অগ্রাধিকার কোনো আলোচনায় বসা নয়, বরং পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে উদ্ধৃত হয়ে ইরানের জ্যেষ্ঠ আলোচক কাজেম গারিবাবাদি বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়, বরং ২০০ শতাংশ প্রস্তুতি নিয়ে দেশকে রক্ষা করা।”
তিনি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। তবে আলোচনা উপযোগী পরিবেশ তৈরি হলেও ইরান আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেবে না। গারিবাবাদি স্মরণ করিয়ে দেন, গত জুনে আলোচনার দ্বারপ্রান্তে থাকা অবস্থায় ইসরায়েল ও পরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শিকার হয়েছিল ইরান।
সেনাবাহিনীর শক্তি প্রদর্শন
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা জোরালোভাবে তুলে ধরছে। গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর থেকেই ধারাবাহিক সামরিক মহড়া চালানো হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ইরানি সেনাবাহিনী ঘোষণা দেয়, এক হাজার নতুন ‘কৌশলগত’ ড্রোন তাদের বহরে যুক্ত হয়েছে। এসব ড্রোনের মধ্যে রয়েছে আত্মঘাতী ড্রোন, যুদ্ধ ও নজরদারি ড্রোন এবং সাইবার যুদ্ধ সক্ষম উড়োজাহাজ, যা স্থল, আকাশ ও সমুদ্রে স্থির কিংবা চলমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
সেনাপ্রধান আমির হামাতি বলেন, “আমাদের সামনে যে হুমকি রয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত যুদ্ধক্ষমতা ও যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে কৌশলগত সুবিধা ধরে রাখাই সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য।”
এদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আগেই জানিয়েছে, প্রয়োজনে তারা ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম।
সাধারণ মানুষের আতঙ্ক
তেহরানসহ সারা দেশে সাধারণ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। একদিকে হামলার হুমকি, অন্যদিকে আলোচনার ইঙ্গিত—এই দ্বৈত অবস্থান জনজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
সরকারের সমর্থকেরা এখনো দৃঢ় অবস্থানে থাকলেও বহু সাধারণ নাগরিক নতুন যুদ্ধের সম্ভাবনায় শঙ্কিত। তেহরানের এক তরুণী আল জাজিরাকে বলেন, “যদি আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি মারা যাবে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ।” অন্য একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি বলেন, “যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। আমরা চাই না আবার রাতের বেলা বোমার শব্দে ঘুম ভাঙুক।”
বেসামরিক প্রস্তুতি ও আশ্রয় সংকট
যুদ্ধের আশঙ্কায় সরকার বেসামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোর গভর্নরদের বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন, যাতে জরুরি প্রয়োজনে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা যায়।
তেহরানের মেয়র আলিরেজা জাকানি জানিয়েছেন, শহরে ভূগর্ভস্থ পার্কিং শেল্টার নির্মাণকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এসব আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে আরও কয়েক বছর লাগবে। ফলে আপাতত সম্ভাব্য বিমান হামলার সময় সাধারণ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আবারও দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—যেমনটি ঘটেছিল গত জুনের যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের সময়।
এক তরুণী বলেন,“যুদ্ধ হোক বা না হোক, চারপাশে শুধু মৃত্যু আর ভয়। আমরা আর সেটা সহ্য করতে পারছি না।”
সূত্র- আলজাজিরা।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর