তারা দুজনই সরকারি চাকরিজীবী। সরকারি চাকরির আড়ালে প্রায় এক দশক ধরে নিয়ন্ত্রণ করছেন বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ঠিকাদারি ব্যবসা। তাদের দাপটে অসহায় লাইসেন্সধারী সাধারণ ঠিকাদাররা। শুধু তাই নয়, প্রতিটি টেন্ডারে তারা পছন্দমত কাজ নেয়ার পর বাকি কাজগুলো অন্য ঠিকাদাররা করতে পারেন।
চাকরির পাশাপাশি ঠিকাদারি ব্যবসা করে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। তাদের রয়েছে জমি, ফ্ল্যাট, বাগান, গাড়ি ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ তারা হলেন- জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান এবং থানচি উপজেলা চেয়ারম্যানের সচিব সনদ কান্তি দাশ।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এ মুজিব-সনদ চক্র কোটি কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিয়েছেন। গত ১০ বছরে থানচি উপজেলায় প্রায় শত কোটি টাকার কাজ করেছেন তারা। এখনও তাদের দাপট এতটুকু কমেনি। তাদের কাছে জিন্মি সবাই।
ছাত্রলীগ থেকে ঠিকাদার- স্থানীয় সূত্র জানায়, সনদ কান্তি দাশ একসময় জেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন । পরে তৎকালীন সংসদ সদস্য বীর বাহাদুরের সুপারিশে উপজেলা চেয়ারম্যানের সচিব পদে চাকরি নেন। যোগদানের পর তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মুজিবকে হাত করেন। এরপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সব ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণে নেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন পাড়ায় নলকুপ স্থাপন, পাহাড়ে জিএফএস পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ রিং ওয়েল খননসহ বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজের নামে-বেনামে পরিচালনা করতেন সনদ দাশ। প্রকৌশলী মুজিবুর তার অংশীদার হওয়ার সুবাদে কোনোরকম তদারকি ছাড়া কাজের বিল উত্তোলন করে নিতেন তিনি।
তবে এসব অনিয়মের পরও সবাই চুপ থাকতেন। কারণ উপজেলা অফিস থেকে শুরু করে জেলা অফিসের সবাই লাভের ভাগ পেতেন। আর যদি কেউ প্রতিবাদ করতেন তাহলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ধামাচাপা দিতেন সনদ। আর এভাবেই উত্থান সনদের। এরপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, থানচিতে অফিস না করে জেলা শহরে মুজিবের সঙ্গে ঠিকাদারি কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতেন সনদ কান্তি দাশ। তার বিরুদ্ধে প্রায় সময় অফিসে না আসার অভিযোগ দেয়া হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনোরকম ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সালিশের পর ধামাচাপা এদিকে গেল বছরের জুলাই বিপ্লবের ছাত্র আন্দোলন বিরোধী মিছিলে সনদ প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পালিয়ে গেলেও সনদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এছাড়া ৫ আগস্ট পরবর্তী নলকূপ স্থাপনের নামে স্থানীয়দের কাছ থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগে সনদের বিরুদ্ধে সালিশ হয়। বিষয়টি তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে ধামাচাপা দেন বলেও অভিযোগ উঠে। এরপর থেকে তিনি আড়ালে চলে যান। তবে আড়ালেই থেকেই চালিয়ে যান ঠিকাদারি ব্যবসা।
অপরদিকে, মুজিবুর রহমান সরকারি চাকরি থেকে অবসর গেলেও ঠিকাদারি ব্যবসায় কমেনি প্রভাব। পরে মুজিব বান্দরবান জেলা শহরে পৌর পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পিডির দায়িত্ব পান। এ নিয়ে ওই অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তৈরি হয় বিস্ময়। নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দেকে ম্যানেজ করে তিনি এ পদ পান বলে অভিযোগ উঠে।
দায় স্বীকার একজনের, অন্যজনের ‘নো কমেন্টস’- জসিম নামের একজন ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, ‘জনস্বাস্থ্যের বরাদ্দের শতকরা ৫০ ভাগের বেশি কাজ করেছেন মুজিব-সনদ সিন্ডিকেট। নির্বাহীর প্রকৌশলীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ও কাজ পেতে অগ্রিম টাকা দেয়ায় ভালো কাজগুলো তাদেরই দেয়া হয়। এরপর অন্য ঠিকাদাররা কাজ পান। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে একচেটিয়া ঠিকাদারি করে তারা বনে গেছেন শত কোটি টাকার মালিক। বান্দরবান শহরের বিভিন্ন জায়গায় তাদের জমি, ফ্ল্যাট, বাগান, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।’
অভিযোগ বিষয়ে জানতে সনদ দাশের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কাজ করার বিষয় স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি একসময় কাজ করতাম। তবে এখন কাজ করি না। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তবে তিনি কোনো কাজ দেন না। তার সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হয়।
একই বিষয়ে জানতে চাইলে মজিবুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে কোনোরকম মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর