বাজেট ফোনের মধ্যে টেকনো স্পার্ক গো ৩ বেশ আলোচিত একটি নাম। এক সপ্তাহ ব্যবহার করে দেখা গেল টেকনো স্পার্ক গো ৩ বাজেট ফোনটি আপনার দৈনন্দিন জীবনে কী করতে পারে এবং কী করতে পারে না।
টেকনো স্পার্ক গো ৩ নিয়ে এক সপ্তাহ কাটিয়ে আমি বুঝেছি-
শুরুতে আমার ধারণা ছিল এটি সাধারণ বাজেট ফোনের মতোই হবে। অর্থাৎ কাজ করবে, কিন্তু প্রায় সব জায়গায় আপস করতে হবে। কিন্তু সত্যি কথা হলো, এই ফোনটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আপনাকে হতাশ করে না। দৈনন্দিন ব্যবহারে এটি ঠিকঠাক কাজ করছে এবং প্রয়োজন মতো পারফর্ম করছে। বাজেটের মধ্যে হলেও এর ব্যবহার অভিজ্ঞতা দারুণ”।
নিশ্চিতভাবেই বেস মডেলের জন্য ১২,৯৯৯ টাকায় স্পার্ক গো ৩ এমন একটি 'সুইট স্পট' অর্জন করেছে যা বাংলাদেশের বেশির ভাগ ক্রেতার জন্য খুবই আকর্ষণীয়। এটা না ফ্ল্যাগশিপ, না একেবারেই সাধারণ বাজেট ফোন। এই প্রাইস রেঞ্জে এর পারফরম্যান্সও খুবই ভালো। তাই চলুন, একে একটু ভালো করে খতিয়ে দেখি টেকনো কি সত্যিই এই দাম-মানের সমীকরণটা ঠিকঠাক মিলাতে পেরেছে কি না।
বিল্ড কোয়ালিটি: প্রিমিয়াম বলে মনে হলেও আসলে কতটা প্রিমিয়াম?
ফোনটা হাতে নিলে প্রথম যে চিন্তা আসে, সেটা হলো “এটা কি সত্যিই ১২,৯৯৯ টাকার ফোন?” টাইটানিয়াম গ্রে ফিনিশটা দেখতে একদম প্রিমিয়াম, টেক্সচারড এবং মার্জিত। সত্যিই বলতে গেলে এটা প্লাস্টিকের মতো সস্তা ফিল দেয় না। ১৬৫ মিমি লম্বা এবং ২০০ গ্রামের নিচে ওজন হওয়ায় এক হাতে ধরে ব্যবহার করাও খুব স্বাচ্ছন্দ্যের। এই ফোনটা ধরে থাকলে বাজেট ফোনের মতো অনুভূতিই হয় না।
ফোনটা শুধু সুন্দর নয়, বরং বেশ মজবুতভাবে তৈরি। ফোনটায় আইপি৬৪ রেটিং থাকায় ধুলো-ময়লা ও পানি প্রতিরোধ করতে পারে। আর ১.২ মিটার পর্যন্ত উচ্চতা থেকে পড়ে গেলেও ফোনটি সুরক্ষিত থাকবে।মানে, সাধারণ বাজেট ফোনের মতো ঝুঁকি নিয়ে ভয়ে ব্যবহার করতে হবে না- এটি স্বস্তিতে ব্যবহার করতে পারবেন।

ডিসপ্লে: এই দামে যা ভাবেননি, সেটাই এখানে আছে
এই ফোনের সবচেয়ে বড় চমক নিঃসন্দেহে এর ৬.৭৫ ইঞ্চির ১২০ হার্জ ডিসপ্লে। এই দামের ফোনে সাধারণত আমরা ৬০ হার্জজেই অভ্যস্ত, ভাগ্য ভালো হলে ৯০ হার্জ । কিন্তু এখানে সরাসরি ১২০ হার্জ আর এর পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। স্ক্রল করলেই বোঝা যায়, সবকিছু কতটা স্মুথ। হোয়াটসঅ্যাপ চালানো, ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করা কিংবা সাধারণ ব্রাউজিং সবই খুব দ্রুত আর ঝামেলাহীন মনে হয়। দৈনন্দিন ব্যবহারে এই স্মুথনেসটা সত্যিই অভিজ্ঞতাকে অন্য লেভেলে নিয়ে যায়। ডিসপ্লেটির এইচডি প্লাস রেজোলিউশন দৈনন্দিন কাজের জন্য যথেষ্ট শার্প, আর ৪৪০ নিটস ব্রাইটনেস ঢাকার কড়া রোদেও স্ক্রিন দেখতে কোনো ঝামেলা করে না। সব মিলিয়ে, এই দামে এমন একটি ডিসপ্লে সত্যিই বাড়তি পাওনা বলতেই হয়।
পারফরম্যান্স: আপস করার প্রশ্নই নেই
৪ জিবি মেইন + ৪ জিবি মেমরি ফিউশন টোটাল ৮ জিবি র্যামের সাথে থাকা ইউনিসক টি৭২৫০ প্রসেসর দৈনন্দিন ব্যবহারের সব কাজ বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই সামলে নেয়। হোয়াটসঅ্যাপ চালানো, ইমেইল চেক করা, ইউটিউব দেখা বা সাধারণ ব্রাউজিং- কোথাও চোখে পড়ার মতো ল্যাগ বা আটকে যাওয়ার সুযোগ নেই। একসাথে একাধিক অ্যাপ খোলা রেখেও ব্যবহার করলে ফোনটা ঠিকঠাকই কাজ করে। হ্যাঁ, এটাকে গেমিংয়ের জন্য বানানো কোনো পাওয়ারফুল ফোন বলা যাবে না। তবে বাস্তব জীবনে বাংলাদেশে যেভাবে আমরা ফোন ব্যবহার করি- সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও দেখা, অনলাইন কাজকর্ম সেই সব কিছুর জন্য এই পারফরম্যান্স পর্যাপ্ত। সহজ কথায়, প্রতিদিনের কাজে ফোনটা আপনাকে বিরক্ত করবে না, বরং নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হিসেবেই কাজ করবে।
একজন টেক এনথুজিয়াস্ট হিসেবে সহজ করে বললে- আমি নিজে ব্যবহার করতে গিয়ে বুঝেছি, ১২৮ জিবি ভ্যারিয়েন্টটাই প্র্যাকটিক্যাল। দাম একটু বেশি (১৪,৪৯৯ টাকা), কিন্তু সেই অতিরিক্ত টাকাটা পুরোপুরি জাস্টিফাইড।
ব্যাটারি: সত্যিই প্রশংসার যোগ্য
পাঁচ হাজার এমএএইচ ব্যাটারি দিয়ে আমি মাঝারি থেকে ভারী ব্যবহারে প্রায় ১৮-২০ ঘণ্টা চলতে পারি। অর্থাৎ চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তার দরকার নেই, পুরোদিন ধরে ব্যবহার করা যায়। আর ১৫ ওয়াট ফাস্ট চার্জিং দিয়ে শূন্য থেকে পুরো চার্জ হতে সময় লাগে প্রায় ৯০ মিনিট। এই দামে ব্যাটারির এই পারফরম্যান্স সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।
ক্যামেরা: সলিড পারফরম্যান্স কিন্তু হাই-এন্ড না
১৩ মেগাপিক্সেলের রিয়ার ক্যামেরা ডুয়াল এলইডি ফ্ল্যাশসহ দিনের আলোতে সঠিক রঙ এবং ভালো ডিটেইলসসহ মানসম্মত ছবি তোলে। কম আলোতে ছবিগুলো কিছুটা নয়েজি বা ঘোলাটে হয়, তবে এটা একটা বাজেট ফোন সেই কারণে এটা মেনে নেওয়া যায়। ৮ মেগাপিক্সেলের সামনের ক্যামেরা ভিডিও কল এবং সেলফি দুটোই ভালোভাবে সামলাতে পারে। সোজা কথায়, এটি কাজের উপযোগী ফটোগ্রাফি দেয়, কিন্তু ফ্ল্যাগশিপ লেভেলের নয় আর ১২,৯৯৯ টাকায় এটা গ্রহণযোগ্য।
টেকনো’র এআই ফিচারগুলো: বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য
এলা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, ছবি থেকে ডকুমেন্ট বানানো, এআই রাইটিং হেল্প, ছবির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান আর হাই ট্রান্সলেট যা বাংলা সাপোর্ট করে-এসব ফিচার সত্যিই কাজে লাগে। এগুলো কোনো জটিল বা “শো-অফ” ফিচার নয়, বরং ব্যবহারিকভাবে খুবই সুবিধাজনক।আর ফোনের পাশে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরটা দ্রুত কাজ করে এবং নির্ভরযোগ্য।
সাধারণ বাজেটে অপ্রত্যাশিত ফিচার: ইনফ্রারেড রিমোট
এই ফোনের সবচেয়ে মজার ফিচারগুলোর একটা হলো এর বিল্ট-ইন আইআর সেন্সর। এর মাধ্যমে সরাসরি টিভি বা এসির রিমোট হিসেবে ফোনটা ব্যবহার করা যায়।বাংলাদেশে যেখানে এখনও অনেক পুরনো মডেলের টিভি বা এসি ব্যবহার হয়, সেখানে এই ফিচারটা আসলেই বেশ কাজে লাগে। এটা কোনো লোক দেখানো ফিচার নয়- প্রকৃতপক্ষে, দৈনন্দিন জীবনে এটি খুবই প্র্যাকটিক্যাল এবং কাজের জিনিস।

কী কাজ করে-
✓ এই দামে প্রিমিয়াম বিল্ড কোয়ালিটি
✓ ১২০ হার্জ স্মুথ ডিসপ্লে, ব্যবহার করার সময় বাস্তবে পার্থক্য তৈরি করে
✓ দুর্দান্ত ব্যাটারি লাইফ
✓ বাস্তবে কাজে লাগার মতো এআই ফিচার
✓ বাজেট ফোনে আইপি ৬৪ ডিউরেবিলিটি
✓ দৈনন্দিন কাজের জন্য ফাস্ট পারফরম্যান্স
✓ আইআর রিমোট কন্ট্রোল- একদম প্র্যাকটিক্যাল ফিচার
কী কাজ করে না / সীমাবদ্ধতা-
✗ চার্জিং স্পিড ঠিক আছে, কিন্তু ২০২৬ সালের মানদণ্ডে দ্রুত নয়
✗ ডিসপ্লে রেজোলিউশন এইচডি প্লাস (ফুল এইচডি নয়)
শেষ কথা: এটা কার জন্য?
টেকনো স্পার্ক গো ৩ মূলত বাংলাদেশের বাস্তব জীবনকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট বা পড়াশোনার জন্য নির্ভরযোগ্য ফোন দরকার এমন শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বেশ ভালো অপশন। ঢাকার ট্রাফিকের মধ্যে যাতায়াত করা তরুণ পেশাজীবীদের জন্যও এটি কাজে লাগে, যারা মিটিংয়ের ফাঁকে কাজ চালিয়ে যেতে চান। এছাড়া যাদের বাসা বা অফিসে নেটওয়ার্ক সমস্যা থাকে তাদের জন্যও এটি কার্যকর।
স্পার্ক গো ৩ কোনো ‘ফ্ল্যাগশিপ কিলার’ হওয়ার দাবি করে না। এটি চমৎকার ছবি তোলা বা ভারী গেমিংয়ের প্রতিশ্রুতি দেয় না। বরং এটি টেকসই, নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্স এবং স্মুথ ব্যবহার সেগুলোই বাস্তবে দেয়।
আপনার যদি এমন একটি ফোন লাগে যা প্রতিদিন ব্যবহার করতে গিয়ে আপনাকে হতাশ করবে না, ডিসপ্লে স্মুথ, লাইফস্টাইলকে সহজ করবে এবং পকেটও ভারী করবে না তাহলে স্পার্ক গো ৩ আপনার পছন্দের তালিকায় থাকা উচিত। এটা যেন বলছে, “আমি বাজেট ফোন কিন্তু সস্তা নই।”
বর্তমান দামে এটি বাংলাদেশের বাজারে সবচেয়ে স্মার্ট বাজেট ফোনগুলোর একটি। ডিভাইসটি এখন সারা বাংলাদেশের সকল টেকনো আউটলেটে পাওয়া যাচ্ছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর