চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাশাপাশি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৫ জন কর্মচারীকে শাস্তিমূলক বদলি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে এসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হাসিম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২-এর ৫০ ধারা অনুযায়ী জনস্বার্থে অভিযুক্ত কর্মচারীদের বদলিপূর্বক মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে সংযুক্ত করা হয়েছে। বদলির আওতায় থাকা কর্মচারীরা বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অডিট সহকারী, ইঞ্জিন ড্রাইভার, স্টেনো টাইপিস্ট, উচ্চ বহিঃসহকারী, ইসিএম ড্রাইভার ও মেসনের মতো পদে দায়িত্ব পালনকারীরাও রয়েছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের আদেশে উল্লেখ করেছে, অভিযুক্ত কর্মচারীরা আন্দোলনের নামে বন্দর এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে লক্ষ্যে আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
শুধু বদলিতে সীমাবদ্ধ নয়, অভিযুক্ত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অফিস আদেশের মাধ্যমে অনুরোধ জানানো হয়েছে—সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নামে থাকা সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বদলি হওয়া কর্মচারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন—এনসিটি ইস্যুতে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির (অডিট সহকারী), মো. ইব্রাহিম খোকন (ইঞ্জিন ড্রাইভার), মো. জহিরুল ইসলাম (স্টেনো টাইপিস্ট), মানিক মিস্ত্রি (ইসিএম ড্রাইভার) ও মো. শামসু মিয়া (মেসন)।
এ বিষয়ে জারি করা অফিস আদেশের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএস আই) মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে আসার পর আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়েন নৌপরিবহন উপদেষ্টা। বন্দর ভবনে প্রবেশের সময় উপদেষ্টার গাড়ি আটকে রেখে স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। পরে উপদেষ্টা হেঁটে ভবনে ঢোকার সময়ও তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এ সময় ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের দালালেরা—হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘গো ব্যাক অ্যাডভাইজার, গো ব্যাক’, ‘মা, মাটি, মোহনা—বিদেশিদের দেব না’সহ নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বন্দর এলাকা।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে বন্দর ভবনে প্রবেশ করে নৌ উপদেষ্টা বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারী প্রতিনিধি এবং বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে নৌপরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন জানান, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঠেকানো যাবে না। তিনি আরও বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর সচল করা হবে এবং কেউ বাধা দিলে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে।
এদিকে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবারই ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ আজ শুক্রবার সকাল থেকে চলমান কর্মবিরতি ৪৮ ঘণ্টার জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। পরিষদের নেতারা জানিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে সরকার যদি তাদের দাবির বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না জানায়, তাহলে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কর্মসূচি দেওয়া হবে।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর