বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ভোটগ্রহণ স্থগিত বা বাতিল হওয়ার ঘটনা একেবারে বিরল নয়। সহিংসতা, কারচুপি, ভয়ভীতি বা স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বা আসনের নির্বাচন বিভিন্ন সময়ে স্থগিত কিংবা বাতিল করেছে।
আইনি ভিত্তি কী?
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট বন্ধ বা বাতিলের বিষয়টি রয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ৯১(ক) ধারায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো আরপিও প্রণয়ন করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে একাধিক সংশোধনী আনা হয়েছে—সর্বশেষ সংশোধনী হয়েছে ২০২৫ সালে।
২০২৩ সালে করা এক সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো কেন্দ্রে বড় ধরনের অনিয়ম, কারসাজি বা ভোট প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার প্রমাণ পেলে ইসি সেই কেন্দ্রের ভোট বা ফল বাতিল করে পুনরায় ভোটের নির্দেশ দিতে পারত; তবে পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা সীমিত ছিল।
এই সংশোধনীর পটভূমি ছিল ২০২২ সালের গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচন। সেবার অনিয়মের অভিযোগে পুরো উপনির্বাচন বাতিল করে কমিশন, যা রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে আইন সংশোধন করে পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়।
২০২৫ সালের সংশোধনী
২০২৫ সালে ৯১(ক) ধারায় পুনরায় পরিবর্তন এনে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়। এখন তফসিল ঘোষণার পর থেকে গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত—অর্থাৎ নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে, এমনকি ভোটের দিনও—ইসি প্রয়োজন হলে নির্বাচন বন্ধ বা বাতিল করতে পারে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচারণার আগেই যদি সহিংসতা বা গুরুতর অনিয়ম শুরু হয়, তাহলেও কমিশন নির্বাচন স্থগিত করতে পারে।
কোন পরিস্থিতিতে ভোট বাতিল হতে পারে?
১. কেন্দ্রভিত্তিক সিদ্ধান্ত:
কোনো ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে—যেমন ব্যালট পেপারে জাল সিল মারা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই বা মারাত্মক সহিংসতা—প্রিজাইডিং অফিসার তাৎক্ষণিকভাবে ভোট বন্ধ করতে পারেন।
২. কমিশনের হস্তক্ষেপ:
প্রিজাইডিং অফিসার ব্যবস্থা না নিলে কমিশন রিটার্নিং অফিসারকে কেন্দ্র বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে।
৩. পুরো আসনের ভোট বাতিল:
যদি কোনো আসনে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়—সিসিটিভি ফুটেজ, প্রশাসনিক রিপোর্ট বা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে—তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে পুরো আসনের ভোট বাতিল করা যেতে পারে।
৪. আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়া:
ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে না পারা, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া বা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পরিস্থিতিতেও ইসি ভোট বন্ধ করতে পারে।
৫. প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব:
রিটার্নিং অফিসার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কমিশন তাকে সরিয়ে দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া পুনর্বিন্যাস করতে পারে।
স্থগিত বনাম বাতিল
সাময়িক বিশৃঙ্খলা—যেমন কেন্দ্রের বাইরে ককটেল বিস্ফোরণ বা হাতাহাতি—কিন্তু ব্যালট অক্ষত থাকলে প্রিজাইডিং অফিসার সাময়িকভাবে ভোট স্থগিত রাখতে পারেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় ভোট শুরু হয়।
অন্যদিকে, গুরুতর অনিয়ম প্রমাণিত হলে কেন্দ্র বা আসনের ভোট পুরোপুরি বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের হাতে ভোট স্থগিত বা বাতিলের সুস্পষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে কমিশন সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর