সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার জেলার চারটি আসনে অংশ নেওয়া ১৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০ জনের নির্বাচনী জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। বিজয়ী ও তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া বাকি প্রার্থীরা প্রদত্ত মোট বৈধ ভোটের এক অষ্টমাংশও না পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে।
নির্বাচন পরবর্তী ফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কয়েকটি আসনে বড় দুই দলের বাইরে অন্য প্রার্থীদের প্রতি ভোটারদের আগ্রহ ছিল খুবই সীমিত।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৪১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো প্রার্থী সংশ্লিষ্ট আসনে প্রদত্ত মোট বৈধ ভোটের এক অষ্টমাংশ (১/৮) ভোট না পেলে তার নির্বাচনী জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। সে অনুযায়ী চার আসনে ১০ জন প্রার্থীর জামানতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
কক্সবাজার–১ (চকরিয়া–পেকুয়া) এ আসনে মোট বৈধ ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৪৩৭। জামানত রক্ষায় প্রয়োজন ছিল অন্তত ৪৫ হাজার ৩০৪ ভোট। বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী সালাহউদ্দীন আহমদ ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল্লাহ আল ফারুক ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. সারওয়ার আলী কুতুবী পেয়েছেন ৪ হাজার ৫২৮ ভোট। ফলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হচ্ছে।
চকরিয়ার ভোটার আবদুল করিম বলেন, এবার মূল লড়াই ছিল দুই প্রার্থীর মধ্যে। অন্য প্রার্থীদের প্রচার তেমন চোখে পড়েনি।
কক্সবাজার–২ (মহেশখালী–কুতুবদিয়া) এ আসনে মোট বৈধ ভোট ২ লাখ ৩২ হাজার ৭০৯। জামানত রক্ষায় প্রয়োজন ছিল ২৯ হাজার ৮৮ ভোট। বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জিয়াউল হক পেয়েছেন ৮ হাজার ৭৯৯ ভোট, জাতীয় পার্টির মো. মাহমুদুল হক ৭৫৭ ভোট এবং গণঅধিকার পরিষদের এস এম রোকনুজ্জামান খান পেয়েছেন ১৯৭ ভোট। ফলে তিনজনের জামানত বাজেয়াপ্ত হচ্ছে।
কুতুবদিয়ার কলেজশিক্ষক হাবিব উল্লাহ বলেন, ভোটাররা এবার হিসাব করে ভোট দিয়েছেন। যাদের জয়ের সম্ভাবনা দেখেননি, তাদের দিকে ঝুঁকেননি।
কক্সবাজার–৩ (সদর–রামু–ঈদগাঁও) এ আসনে ছয়জন প্রার্থীর মধ্যে চারজন জামানত হারাচ্ছেন। মোট বৈধ ভোট ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫৯৪। জামানত রক্ষায় প্রয়োজন ছিল ৪৪ হাজার ৫৭৪ ভোট। বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী লুৎফুর রহমান কাজল ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শহীদুল আলম বাহাদুর ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুল ইসলাম পেয়েছেন ৫ হাজার ১৪৯ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া ৯৪৭ ভোট, বাংলাদেশ লেবার পার্টির জগদীশ বড়ুয়া ৬০২ ভোট এবং আমজনতা দলের নুরুল আবছার পেয়েছেন ৩৬৭ ভোট।
রামুর মেরুংলোয়ার বাসিন্দা নাসিমা আক্তার বলেন, ছোট দলগুলো প্রার্থী দিলেও মাঠে তেমন সক্রিয় ছিল না। ভোটের সময় মানুষ পরিচিত ও শক্তিশালী প্রতীকের দিকেই গেছে।
কক্সবাজার–৪ (উখিয়া–টেকনাফ) এ আসনে মোট বৈধ ভোট পড়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ২৩১। জামানত রক্ষায় প্রয়োজন ছিল ৩১ হাজার ৯০৩ ভোট। বিজয়ী ও তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নুরুল হক পেয়েছেন ৪ হাজার ৩৩৮ ভোট এবং জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাইফুদ্দিন খালেদ পেয়েছেন ৩৭৯ ভোট। ফলে তাদের জামানতও বাজেয়াপ্ত হচ্ছে।
উখিয়ার ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, এখানে ভোট মূলত দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যরা প্রতীক রাখলেও বাস্তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন না।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, কক্সবাজারের চারটি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত বড় দুই রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরে ছিল। ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাংগঠনিক দুর্বলতা ও প্রচার–প্রচারণার সীমাবদ্ধতায় ভোটারদের আস্থা টানতে পারেননি। ফলে তারা এক অষ্টমাংশ ভোটের শর্তও পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ঘোষণা করে জানান, বিধি অনুযায়ী যেসব প্রার্থী নির্ধারিত ভোট পাননি, তাদের জামানতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
নির্বাচন শেষ হলেও ফলাফলের এই দিকটি এখন আলোচনায়। বিশেষ করে যেসব দল জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়, কিন্তু মাঠের ভোটে সাড়া তুলতে পারেনি, তাদের জন্য এটি আত্মসমালোচনার সময় বলেই মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকেরা।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর