সূর্য যখন ধীরে ধীরে নেমে যায় বঙ্গোপসাগরের জলে, তখন আকাশে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ে। ঢেউ ভাঙার শব্দে মিশে থাকে সমুদ্রের চিরচেনা সুর। সেই দৃশ্য দেখতে অনেকেই ভিড় করেন কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপ- এর দক্ষিণপাড়া সমুদ্রসৈকতে। কিন্তু গত শনিবার বিকেলে সেখানে গিয়ে অনেকের মন ভারী হয়ে আসে। যেখানে একসময় ঘন কেয়াবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত, সেখানে এখন ফাঁকা বালুচর আর কাটা গাছের গুঁড়ি।
স্থানীয়রা জানান, সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণপাড়া এলাকায় সারি সারি কেয়া গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কারা বা কোন উদ্দেশ্যে এ কাজ করেছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে কাটা গাছের সংখ্যা কম নয়। সৈকতের একটি বড় অংশজুড়ে গাছের শিকড় উপড়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
দক্ষিণপাড়ার জেলে আবদুস সালাম বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকে এই কেয়াবনের ভেতর দিয়ে সাগরে গেছি। ঝড়ের সময় এই গাছগুলো ঢেউয়ের ধাক্কা অনেকটাই সামলে দিত। এখন যদি এগুলো না থাকে, বড় জলোচ্ছ্বাসে কী হবে ভাবতেই ভয় লাগে।
দ্বীপের বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, সূর্যাস্ত দেখতে গিয়ে তিনি এই দৃশ্য দেখেন। তিনি বলেন, ঘন কেয়াবন ছিল জায়গাটায়। বাতাসে দুলত, ছায়া দিত। এখন শুধু কাটা গুঁড়ি। মনে হয়েছে কেউ দ্বীপের বুক থেকে সবুজ একটা অংশ তুলে নিয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, কেয়া গাছ শুধু গাছ নয়, দ্বীপের পরিচয়ের অংশ। উপকূলীয় পরিবেশে কেয়া গাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বালুচরকে শক্ত করে ধরে রাখা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় ঢেউয়ের আঘাত কমানো এবং উপকূলের ভাঙন ঠেকাতে এই গাছ প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।
দ্বীপের এক নারী বাসিন্দা রহিমা আক্তার বলেন, পর্যটকেরা ছবি তুলতে কেয়াবনের ভেতর আসে। বাচ্চারা খেলাধুলা করে। এখন জায়গাটা ফাঁকা আর নির্জন লাগছে। গাছ কাটলে শুধু পরিবেশ না, আমাদের জীবনের ছন্দও বদলে যায়।
স্থানীয় এক তরুণ পরিবেশকর্মী মাহমুদুল হক বলেন, সেন্ট মার্টিনকে বাঁচাতে হলে কাগজে কলমে পরিকল্পনা নয়, মাঠে কার্যকর নজরদারি দরকার। নিয়মিত টহল, সিসিটিভি বা স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে পাহারা ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নইলে একই ঘটনা আবার ঘটবে।
দ্বীপের প্রবীণ বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, আগে কেয়া গাছ এত ঘন ছিল যে ভেতরে ঢুকলে রোদ লাগত না। এখন ধীরে ধীরে কমছে। যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, কয়েক বছর পর হয়তো এই বন শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে।
সাইফুল ইসলাম নামের এক যুবক বলেন, আমরা এখানে আসি প্রকৃতির জন্য। যদি গাছ কেটে রিসোর্ট বা অন্য কিছু তৈরি করা হয়, তাহলে এই দ্বীপ আর আগের মতো থাকবে না। উন্নয়ন দরকার, কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়।
পরিবেশবিদদের মতে, প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া কেয়াবন ধ্বংস হলে দ্বীপের ভৌগোলিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা সভাপতি এইচ এম এরশাদ।
তিনি বলেন, কেয়া গাছ উপকূলের রক্ষাকবচ। এগুলো কেটে ফেলা মানে দ্বীপকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। সেন্ট মার্টিন পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা। এখানে গাছ নিধন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তার দাবি, দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জাফর আলমের কথায় ক্ষোভ স্পষ্ট।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই দ্বীপটা সবুজ থাকুক। পর্যটকরা যে সৌন্দর্য দেখতে আসে, তা যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী দেখবে?
তার মতে, পরিবেশ রক্ষা না করলে পর্যটন খাতও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছেন। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করা গেলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ দীর্ঘদিন ধরেই নানা পরিবেশগত চাপে রয়েছে। অতিরিক্ত পর্যটন, অবৈধ স্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং প্রাকৃতিক বনভূমি সংকোচন- সব মিলিয়ে দ্বীপের ভারসাম্য নড়বড়ে। এই প্রেক্ষাপটে কেয়াবন উজাড়ের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দক্ষিণপাড়ার সেই সৈকতে এখনো বাতাস বইছে, ঢেউ ভাঙছে, সূর্য ডুবছে আগের মতোই। কিন্তু সবুজের যে দেয়ালটি একসময় ঢেউ আর বালুচরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকত, তার জায়গায় তৈরি হয়েছে এক নীরব শূন্যতা।
দ্বীপবাসীর আশা, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টরা দ্রুত উদ্যোগ নেবেন, যাতে বাকি কেয়াবন রক্ষা পায় এবং উজাড় হওয়া অংশে পুনরায় গাছ লাগানো হয়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর