সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও দলটি শেষ মুহূর্তে সেই শপথ থেকে বিরত থাকে। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা; অনেকেই বলছেন, ক্ষমতায় বসেই ‘পল্টি’ নিল বিএনপি।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে অনুষ্ঠান শুরুর আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, বিএনপির কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি এবং বর্তমান সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের বিধানও নেই। তার ভাষ্য, গণভোটের রায় অনুযায়ী যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হয়, তাহলে আগে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিষদের সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন, সেই বিধানও সংবিধানে স্পষ্ট থাকতে হবে। তৃতীয় তফসিলে প্রয়োজনীয় ফরম যুক্ত করে সংসদে সাংবিধানিকভাবে গৃহীত হওয়ার পরই শপথের প্রশ্ন আসতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলেছি, সামনেও সংবিধান মেনেই চলব।” এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।
বিএনপির এই অবস্থানের বিপরীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর ৬৮ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা শপথকক্ষ ত্যাগ করেন। ঢাকা–৬ আসনের বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনও শুরুতে বেরিয়ে গেলেও পরে শপথ নেন বলে জানা যায়।
শপথ অনুষ্ঠান শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, “গণভোটের জনরায়কে প্রথম দিনেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুরু হলো নতুন সংসদের যাত্রা। এবার বিরোধী দলের সিদ্ধান্ত দেখার পালা।” তার এই মন্তব্যের পর অনলাইন পরিসরে বিতর্ক আরও জোরালো হয়।
ওয়াহিদ আল হাসান নামে এক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তোলেন, যে যুক্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ স্থগিত করা হলো, সেই যুক্তি মেনে চললে ২০২৯ সালের আগে নির্বাচন হওয়ার সুযোগই থাকে না। তার মতে, তিন মাস ধরে চলা ঐকমত্য কমিশনের সভা তাহলে কি কেবল নাটক ছিল? রাষ্ট্রের সময় ও অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
কবির ইয়াহমদ নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, কথিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তার দাবি, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথই যদি অসাংবিধানিক হয়, তাহলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সংবিধানের ৭(ক)(খ) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা উচিত। তার ভাষ্য, সংবিধানের একটি অংশ মানা আর অন্য অংশ অমান্য করা একসঙ্গে চলতে পারে না।
মির্জা গালিব নামে এক ব্যবহারকারী আরও বিস্তৃত প্রশ্ন তোলেন। তিনি লেখেন, সংবিধানে গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করলে কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের বিধানও সংবিধানে নেই। তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন সাংবিধানিক হলো কীভাবে? তার প্রশ্ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ যদি অসাংবিধানিক হয়, তাহলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া কীভাবে সাংবিধানিক হয়?
অন্যদিকে বেলায়েত হোসেন নামের একজন মন্তব্য করেন, সংবিধানে যে পদ নেই, সেটি জোর করে সৃষ্টি করা যায় না। তার মতে, সংবিধান সংশোধন ছাড়া সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। আগে জাতীয় সংসদে সাংবিধানিক অনুমোদন, তারপর শপথ—এটাই আইনি ও গণতান্ত্রিক পথ হওয়া উচিত। আইন মানা অপরাধ নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোটে ৬০ শতাংশের বেশি ভোটার ‘হ্যাঁ’ জানান। আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা এবং প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশোধনী বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। তবে কয়েকটি প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকায় সেগুলো বাস্তবায়নে দলটি বাধ্য নয় বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে শপথ ইস্যুতে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা বনাম গণভোটের জনরায়—এই দ্বৈত অবস্থানের মধ্যে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। বিএনপির অবস্থান কৌশলগত নাকি নীতিগত—তা স্পষ্ট হবে সংসদের পরবর্তী পদক্ষেপেই।
সর্বশেষ খবর