মঙ্গলবার বিকেলটা কক্সবাজারের জন্য শুধু আরেকটা দিন ছিল না। যেন বহু প্রতীক্ষার শেষে হঠাৎ করেই এসে দাঁড়ানো এক বিশেষ মুহূর্ত। শহরের ব্যস্ত সড়ক, অলিগলি, চকরিয়া-পেকুয়ার শান্ত গ্রাম- সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে অন্য রকম এক আবহ। কেউ ফোনে খবর নিশ্চিত করছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, দলীয় কার্যালয়ে চলছে মিষ্টিমুখ, কোথাও আবার স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ মিছিল। মানুষের চোখেমুখে গর্ব, কণ্ঠে উচ্ছ্বাস। কারণ, জেলার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম কক্সবাজারের একজন নেতা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন।
বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে বঙ্গভবনের আনুষ্ঠানিক শপথমঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন সালাহউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথবাক্য পাঠ করছিলেন, তখন কক্সবাজারের অসংখ্য মানুষ টেলিভিশন আর মোবাইলের পর্দায় সেই দৃশ্য দেখছিলেন নিঃশব্দ আবেগ নিয়ে। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক নিয়োগ নয়, বরং নিজেদের জেলার দীর্ঘ পথচলার এক প্রতীক।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠনের পর মন্ত্রিপরিষদে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই দায়িত্ব শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের নয়, কক্সবাজারবাসীর কাছে এটি দীর্ঘদিনের এক প্রত্যাশার প্রতীকও বটে। সীমান্ত, সমুদ্র, রোহিঙ্গা ক্যাম্প, মাদক ও আইনশৃঙ্খলার মতো জটিল বাস্তবতায় বসবাস করা একটি জেলার মানুষ মনে করছেন, তাদের অভিজ্ঞ ও পরিচিত একজন নেতা এবার দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে।
জানা গেছে, ১৯৬২ সালের ৩০ জুন, তৎকালীন বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের সিকদার পাড়ায় জন্ম সালাহউদ্দিন আহমদের। সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে বেড়ে ওঠা এই কিশোরের শৈশব কেটেছে গ্রামবাংলার সাধারণ পরিবেশে। পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক ও মাতা বেগম আয়েশা হকের সন্তান তিনি।
পেকুয়ার শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি। মেধা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে নিয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) এবং ১৯৮৬ সালে এলএলএম সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত হয়ে আইনজীবী হিসেবে সনদও নেন। শুধু একাডেমিক কৃতিত্ব নয়, ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহসভাপতি, পরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় একাধিকবার কারাবরণ করতে হয় তাকে।
১৯৮৫ সালে সপ্তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ। বগুড়া জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে নিযুক্ত হন। তবে প্রশাসনিক ক্যারিয়ার দীর্ঘ হয়নি। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সরাসরি রাজনীতিতে নামেন।
টানা তিনবারের সংসদ সদস্য ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার- ১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি। একটানা তিনবার সংসদ সদস্য হয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে একটি রেকর্ড গড়েন। সপ্তম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পান। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর ১০ অক্টোবর তাকে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী করা হয়। পাশাপাশি কক্সবাজার জেলার ইনচার্জ মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক উত্থানের পথটি মসৃণ ছিল না। ২০০৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে এক-এগারোর সময় কারাবন্দি জীবন কাটান দুই বছরের বেশি সময়। ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ কারামুক্ত হন।
২০১৫ সালের ১০ মার্চ দেশের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নাটকীয় ঘটনা ঘটে। ঢাকার উত্তরার একটি বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। দীর্ঘ ৬২ দিন নিখোঁজ থাকার পর ১১ মে ভারতের শিলং শহরে তার সন্ধান পাওয়া যায়, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায়। শিলংয়ে অবস্থানকালে দীর্ঘ আইনি লড়াই, কারাজীবন ও কার্যত নির্বাসনের সময় পার করেন তিনি। সেই সময়েই তাকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। প্রায় এক দশক পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট দেশে ফেরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তার প্রত্যাবর্তনকে দলীয় নেতাকর্মীরা ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দেন।
চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ায় এক নির্বাচনী সভায় তিনি বলেছিলেন, আমার বেঁচে থাকার কথা ছিল না। আমাকে গুম করা হয়েছিল হত্যার উদ্দেশ্যে। আল্লাহ আপনাদের দোয়া কবুল করেছেন। আমার এই নতুন জীবন দেশের মানুষের সেবার জন্য। বক্তব্যটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সেই মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সালাহউদ্দিন আহমদ।
কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মিজানুল আলম বলেন, আজ কক্সবাজারবাসীর জন্য সত্যিই গর্বের একটি দিন। আমাদের প্রিয় নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের হাতে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি পুরো জেলার মানুষের আত্মমর্যাদা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের স্বীকৃতি। প্রত্যন্ত পেকুয়ার মাটি থেকে উঠে তিনি যে পথ পাড়ি দিয়েছেন, তা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার।
তিনি ছাত্ররাজনীতি, কারাবাস, গুম ও নির্বাসনের কঠিন সময় অতিক্রম করে আজ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, তার অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও সাহসিক নেতৃত্ব দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও সুদৃঢ় করবে।
কক্সবাজার সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক হাবিব উল্লাহ বলেন, আজ পুরো জেলাবাসীর জন্য গৌরবের দিন। আমরা একজন যোগ্য মানুষকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছি। তার নেতৃত্বে দেশ যেমন এগোবে, কক্সবাজারও তেমনি নতুন গুরুত্ব পাবে।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না বলেন, আমাদের জেলার একজন অভিজ্ঞ নেতার হাতে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় তুলে দেওয়া হয়েছে। এটি কক্সবাজারবাসীর জন্য গর্বের।
তার মতে, এই দায়িত্ব দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
ব্যক্তিজীবনে চার সন্তানের জনক সালাহউদ্দিন আহমদ। তার স্ত্রী হাসিনা আহমদও ২০০৮ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় পরিবারও নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী। রাজনীতির পাশাপাশি আইন পেশা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে বলে মনে করেন তার ঘনিষ্ঠজনেরা। প্রশাসনিক কাঠামো, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জটিলতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা- তিন দিকের অভিজ্ঞতাই এবার কাজে লাগবে বলে তাদের প্রত্যাশা।
স্থানীয়দের মতে, সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজার বহু বছর ধরে নানা সংকটের মুখোমুখি। রোহিঙ্গা সংকট, মাদকপাচার, মানবপাচার, সমুদ্র ও পর্যটনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা- সব মিলিয়ে এটি দেশের আইনশৃঙ্খলার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ জেলার মানুষ তাই স্বাভাবিকভাবেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছেন বাড়তি প্রত্যাশা নিয়ে।
অনেকে বলছেন, স্থানীয় বাস্তবতা জানা একজন নেতা দায়িত্বে থাকলে সমস্যাগুলোর সমাধানে নতুন উদ্যোগ আসতে পারে। তবে দায়িত্বের ভারও কম নয়। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনের কার্যকারিতা- সবই এখন তার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জড়িত।
মঙ্গলবারের শপথ অনুষ্ঠানের পর সন্ধ্যা নামতেই কক্সবাজার শহরে ছোট ছোট আনন্দ মিছিল দেখা যায়। চকরিয়ার গ্রামাঞ্চলেও ছিল উৎসবের আবহ। অনেকেই বলছেন, এটি শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং জেলার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার একটি মাইলফলক।
পেকুয়ার সিকদার পাড়ার সেই গ্রাম থেকে শুরু করে বঙ্গভবনের শপথমঞ্চ পর্যন্ত পথটি সহজ ছিল না। ছাত্ররাজনীতি, প্রশাসনিক দায়িত্ব, মন্ত্রীত্ব, কারাবাস, গুম, নির্বাসন- সব মিলিয়ে এক নাটকীয় জীবনযাত্রা। এবার সেই অভিজ্ঞতার ভার নিয়ে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বসেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। কক্সবাজারের মানুষ উচ্ছ্বসিত, কিন্তু একই সঙ্গে প্রত্যাশাও বড়।
উৎসবের এই মুহূর্ত পেরিয়ে সামনে এখন বাস্তবতার পরীক্ষা। এই নতুন অধ্যায় তাদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনে। এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর