তরুণদের আত্মত্যাগ ও যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের নবযাত্রা সূচিত হয়েছে। অথচ তামাকের মরণছোবলে আজ প্রতিনিয়ত তরুণরাই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তাই নবগঠিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের জোর দাবি জানিয়েছে তরুণরা।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নটরডেম কলেজে নারী মৈত্রী ও নটরডেম কলেজ সোশিও -ইকোনোমিক ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের দাবি’ শীর্ষক যুব সমাবেশে তরুণরা এই দাবি জানায়। সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নটরডেম কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ও সোশিও-ইকোনোমিক ক্লাবের মডারেটর ফারজানা হোসেন।
সমাবেশে জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ২ কোটি ১৩ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করে। প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে মৃত্যু হয় প্রায় ২ লাখ মানুষের, যা দৈনিক গড়ে ৫৪৫ জনেরও বেশি। তামাক ব্যবহারের ফলে বছরে প্রায় ৩৯.২ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে কার্যত একটি ‘তামাক মহামারী’তে রূপ দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে (২৪ ডিসেম্বর ২০২৫) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদিত হয়। অনুমোদিত অধ্যাদেশে ‘তামাকজাত দ্রব্য’-এর সংজ্ঞার আওতায় নিকোটিন পাউচ এবং সরকার কর্তৃক সময় সময় ঘোষিত অন্য কোনো নিকোটিন দ্রব্য, তা যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ধূমপানের পাশাপাশি সকল প্রকার তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে; ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্টস—এর ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান রাখার বিধান সরকারের নির্দেশনার শর্তাধীন করা হয়েছে; ‘পাবলিক প্লেস’ ও ‘পাবলিক পরিবহণ’-এর সংজ্ঞা ও অধিক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হয়েছে; বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শনসহ ইন্টারনেট বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের সকল প্রকার বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রসার নিষিদ্ধ করা হয়েছে; এবং তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের গায়ে বিদ্যমান ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ৭৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সতর্কবাণী মুদ্রণের বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
ফারজানা হোসেন বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এটিকে আইনে পরিণত না করা হলে এর প্রভাব সীমিতই থেকে যাবে।’
জনস্বাস্থ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রেখে অনুমোদিত অধ্যাদেশটিকে কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে আইনে রূপান্তর করতে নবনির্বাচিত সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘তামাক খাত থেকে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও তামাক ব্যবহারের ফলে চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর কারণে দেশে ক্ষতির পরিমাণ ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই ক্ষতি হ্রাস এবং মৃত্যু রোধের লক্ষ্যেই অধ্যাদেশটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং এর টেকসই বাস্তবায়নের জন্য সংসদে পাস হওয়া অত্যাবশ্যক।’
তরুণদের পক্ষ থেকে মো. সাব্বির ফরাজী বলেন, ‘তামাক কোম্পানিগুলোর প্রধান লক্ষ্যবস্তু আমাদের মতো তরুণরাই। কারণ একজন তরুণকে একবার তামাক ধরাতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে সে তামাকজাত দ্রব্যের ভোক্তা হিসেবে থাকবে। এমন প্রেক্ষাপটে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি অনুমোদন করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন এই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করার দায়িত্ব নবনির্বাচিত সরকারের। কেননা রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে অঙ্গীকারও করেছিলো। তাই একটি তামাকমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে নবগঠিত সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অধ্যাদেশটি পাস করে আইনে পরিণত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
দিনব্যাপী আয়োজিত এই যুব সমাবেশে শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর