• ঢাকা
  • ঢাকা, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ১ মিনিট পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০২:১৭ দুপুর

স্রোতের ওপর ভর করে চলছে অর্থনীতি

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। কুয়াশা ভেজা হাওয়ার ভেতর শান্ত, স্থির জলের ওপর সারি সারি ভাসছে বাঁশের ভেলা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় নদীর বুক জুড়ে কেউ যেন সবুজ-হলুদ রেখা এঁকে দিয়েছে। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, এ শুধু বাঁশ নয়; এ ভাসছে হাজারো পরিবারের স্বপ্ন, ঘাম আর টিকে থাকার গল্প।

এ দৃশ্য কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর। পাহাড়ি জনপদ থেকে কেটে আনা বাঁশগুলো বেঁধে বানানো হয়েছে বড় বড় ভেলা। স্রোতের টানে ধীরে ধীরে ভেসে এসেছে সমতলে। নদী এখানে শুধু জলধারা নয়, এ এক চলমান সড়ক। এই সড়কেই ভেসে আসে জীবিকা।

নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো জানে, এই ভেলাগুলো মানেই বাজার জমবে, হিসাব মেলবে, ঘরে চাল উঠবে। বাঁশ কাটার শ্রমিক থেকে শুরু করে ভেলা বেঁধে নামানো কারিগর, মাঝপথে দেখভাল করা লোক, বাজারের আড়তদার, খুচরা ব্যবসায়ী, মিস্ত্রি- একটি বাঁশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু হাতের পরিশ্রম।

কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফকিরাবাজার বাঁশ বাজার এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। শনি ও মঙ্গলবার বাজার বসে। ওই দুই দিনে লাখ লাখ টাকার বাঁশ কেনাবেচা হয়। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীপাড়ে গমগম শব্দ। কেউ দাম হাঁকছে, কেউ গুনছে, কেউ দড়ি খুলছে, কেউ আবার নতুন করে গুচ্ছ বেঁধে ট্রাকে তুলছে। নদীর বুক থেকে বাজার, বাজার থেকে শহর, শহর থেকে গ্রাম- বাঁশের এই যাত্রা থেমে থাকে না।

ব্যবসায়ীদের মতে, একটি ভেলা মানে কয়েকশো বাঁশ। প্রতিটি বাঁশের পেছনে আছে পাহাড়ি বন, কুড়াল, ঘাম আর ঝুঁকি। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে বাঁশ নামানো সহজ কাজ নয়। বর্ষায় পিচ্ছিল মাটি, শুষ্ক মৌসুমে ধুলো, কখনো সাপের ভয়, কখনো ভাঙা পথ। তবু মানুষ যায়। কারণ জানে, নদীতে ভাসাতে পারলেই মিলবে দাম।

নদীতে নামানোর পর বাঁশগুলো একসঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। মাঝেমধ্যে লম্বা লাঠি দিয়ে দিক ঠিক করে এগিয়ে নেয় কেউ। আবার কোথাও স্রোতের ওপর ছেড়ে দিয়ে দূর থেকে নজর রাখে। বাঁকখালীর স্রোত যেন চেনা পথ ধরে নিজেই পৌঁছে দেয় কাঙ্ক্ষিত ঘাটে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদী কেমন করে অর্থনীতির নীরব সঙ্গী হয়ে থাকে। পাকা সড়ক আছে, ট্রাক আছে, কিন্তু পাহাড় থেকে এত বিপুল পরিমাণ বাঁশ একসঙ্গে নামানোর জন্য নদীর মতো সহজ ও সাশ্রয়ী পথ আর নেই। তাই যুগের পর যুগ ধরে নদীই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা।

ফকিরাবাজারে বাঁশ শুধু বিক্রি হয় না, ভাগ্যও বিক্রি হয়। কেউ একদিনে বড় লট কিনে শহরে সরবরাহ করে লাভ তুলে নেয়। কেউ আবার খুচরা বিক্রি করে সংসার চালায়। কেউ বাড়ি তৈরির কাজের জন্য কিনে নেয়, কেউ মাচা বানাবে, কেউ মাছের খাঁচা, কেউ সেচের কাঠামো। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে বাঁশের সম্পর্ক গভীর। আর সেই সম্পর্কের সেতু এই নদী।

বাকখালী নদীর মইশক্যুম ব্রিজের উপর দাঁড়ালে দেখা যায়, বাঁশের সারি ভাসতে ভাসতে যখন নদীর মাঝখানে থামে, তখন জলের ওপর তৈরি হয় এক অদ্ভুত নকশা। দূর থেকে মনে হয় যেন নদীর বুকে ছড়িয়ে আছে সোনালি চাটাই। রোদ পড়লে সেই বাঁশের গায়ে আলো ঝিলমিল করে। শান্ত জলে প্রতিফলন তৈরি হয়। প্রকৃতি আর পরিশ্রম মিলেমিশে এক হয়ে যায়। এই দৃশ্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে অর্থনীতির অঙ্ক। হাজার হাজার পরিবার সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত এই বাণিজ্যের সঙ্গে। কেউ পরিবহন শ্রমিক, কেউ দড়ি সরবরাহকারী, কেউ বাজারের চা দোকানি। বাজার জমলে সবার মুখে হাসি। বাজার মন্দা হলে সবার কপালে ভাঁজ।

কিন্তু সবকিছু এত সহজ নয়। নদীর নাব্যতা কমলে সমস্যা হয়। কোথাও কোথাও স্রোত কমে গেলে ভেলা আটকে যায়। আবার বর্ষায় হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নামলে বাঁশ ভেসে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যবসায়ী। তবু ঝুঁকি নিয়েই এগোয় তারা। কারণ এ পেশা ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ সবার নেই।

বাঁকখালীর পাড়ের গ্রামগুলোতে গেলে দেখা যায়, বাড়ির উঠোনে বাঁশ শুকোচ্ছে, কেউ ফালি করছে, কেউ মাপ নিচ্ছে। বাঁশ শুধু কাঁচামাল নয়, এটি কারিগরিরও উপাদান। ঝুড়ি, চালুনি, বেড়া, মাচা- সবকিছুতেই বাঁশের ব্যবহার। এই নদী তাই শুধু কাঁচা বাঁশ বয়ে আনে না, বয়ে আনে সম্ভাবনা।

মিঠাছড়ির আক্তার কামাল নামের বৃদ্ধ ব্যবসায়ী বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকে দেখছেন এই দৃশ্য। তার বাবাও বাঁশের ব্যবসা করতেন। তখন নৌকা বেশি ছিল, এখন ট্রাক বেশি। কিন্তু নদীর বুকের ভেলা আজও আছে। এই ধারাবাহিকতা তাকে টেনে রাখে। নদী যেন পরিবারেরই একজন সদস্য।

সন্ধ্যা নামলে বাজার ফাঁকা হতে থাকে। যেসব বাঁশ বিক্রি হয়নি, সেগুলো পাড়ে বেঁধে রাখা হয়। নদীর জলে তখন চাঁদের আলো পড়ে। একটি নদী কেমন করে মানুষের জীবনে ঢুকে পড়ে, এই দৃশ্য তার প্রমাণ। বাঁকখালী শুধু পাহাড় থেকে সমুদ্রে যাওয়ার পথ নয়; এটি মানুষের ভরসার পথ। এখানে জল মানে শুধু স্রোত নয়, মানে কাজ। এখানে ভেলা মানে শুধু বাঁশ নয়, মানে রোজগার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ছবির সারি সারি বাঁশ তাই নিছক কাঠের টুকরো নয়। এগুলো প্রতীক। সংগ্রামের প্রতীক, ঐতিহ্যের প্রতীক, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতীক। নদী যদি শুকিয়ে যায়, এই সারি থেমে যাবে। বাজার স্তব্ধ হবে। তাই নদীকে বাঁচানো মানে এই মানুষগুলোর জীবনকে বাঁচানো। বাঁকখালীর বুক জুড়ে ভাসমান বাঁশের সারি সংশ্লিষ্টদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন শুধু বড় প্রকল্পে নয়; অনেক সময় তা লুকিয়ে থাকে এমন সাধারণ দৃশ্যে। যেখানে একেকটি বাঁশ একেকটি গল্প, একেকটি পরিবার, একেকটি আশার নাম। নদী বয়ে যাবে, বাঁশ ভাসবে, বাজার বসবে। আর সেই স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলবে হাজারো মানুষের জীবন।

সালাউদ্দিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]