সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় কক্সবাজারে চাঞ্চল্যকর এক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। লিখিত পরীক্ষায় নিজে অংশ না নিয়ে ভাড়া করা একজন পরীক্ষার্থীকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়, আর সেই ফলের ভিত্তিতেই চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন প্রকৃত প্রার্থী। পরে মৌখিক পরীক্ষায়ও প্রভাব খাটানো হয়। অর্থ লেনদেন, অডিও স্বীকারোক্তি এবং অতীতের প্রক্সি সিন্ডিকেটের যোগসূত্র- সব মিলিয়ে ঘটনাটি শুধু একজন প্রার্থীর নয়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া গ্রামের আমান উল্লাহ নাহিন (৩১) এই নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার রোল নম্বর ৪৬২১০৬৫।
অভিযোগ উঠেছে, তিনি নিজে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেননি। গত ২৬ ডিসেম্বর তিনি কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে আসবেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে উপস্থিত হন এই প্রতিবেদক। পরে জানা যায়, তিনি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততার সনদ ও ডোপ টেস্টের রিপোর্ট সংগ্রহ করতে গেছেন। সেখানেই তার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের।
প্রথমে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু দীর্ঘ আলাপের একপর্যায়ে স্বীকার করেন, লিখিত পরীক্ষায় তার হয়ে অন্য একজন অংশ নিয়েছেন।
তিনি জানান, কুতুবদিয়া উপজেলার মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। আনোয়ার বর্তমানে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে মেকানিক পদে কর্মরত রয়েছে।
আমানের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আনোয়ারকে অনেকে ‘প্রক্সি ডন’ ও ‘ডিভাইস ডন’ নামে চিনতেন। তার দাবি, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে লিখিত ও মৌখিক- দুই পরীক্ষায়ই উত্তীর্ণ করানোর নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।
আমান উল্লাহ নাহিন বলেন, চুক্তির অর্থের একটি অংশ দিতে দেরি হওয়ায় মৌখিক পরীক্ষার সময় আনোয়ার তাকে সহযোগিতা করেননি। পরে তিনি নিজ উদ্যোগে ভাইভা বোর্ডের একজনকে ‘ম্যানেজ’ করে পরীক্ষা দেন বলে দাবি করেন। তবে কাকে ম্যানেজ করেছেন, জানতে চাইলে তিনি অনুরোধ করেন বিষয়টি প্রকাশ না করতে।
তার ভাষ্য, ‘এটা প্রকাশ হলে আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আনোয়ার তার একাডেমিক সনদের মূল কপি জিম্মি করে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে বাকি টাকা পরিশোধ করে সেগুলো ফেরত নেন।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, লিখিত পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়ার জন্য একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে তিন লাখ টাকার চুক্তি করা হয়। ওই শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় অংশ নেন। তার বাড়িও কক্সবাজার জেলায়।
আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অতীতে ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডি’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি কাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতা ধরা পড়ে। ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব রেসিডেন্স, হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিন কমিটি তাঁর মাস্টার্স পরীক্ষার সনদ স্থগিত করে। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তিনি কারাভোগও করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীর দাবি, সে সময় একটি শক্তিশালী প্রক্সি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্নোত্তর আদান-প্রদান হতো। কারামুক্তির পর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও পরে আবার সক্রিয় হন আনোয়ার- এমন অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উচ্চমাধ্যমিক সনদের ভিত্তিতে তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে জাতীয় বেতন স্কেল- ২০১৫ অনুযায়ী ১৭তম গ্রেডে মেকানিক পদে নিয়োগ পান। বর্তমানে হাটহাজারীতে কর্মরত হলেও চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকায় বসবাস করেন। স্থানীয়দের প্রশ্ন, স্বল্প বেতনের সরকারি চাকরির পাশাপাশি কীভাবে তার জীবনযাত্রার মান এত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাল।
আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অতীতে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও বর্তমান অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার নামে নিউজ হলে অফিসে শোকজ হয়, অনেক খরচ হয়।’ সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিবেদককে চা-নাস্তার জন্য ১০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাহিনকে তারা দীর্ঘদিন ধরেই বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চেনেন। পরিবারের অন্য ভাইয়েরা বিদেশে থাকায় ঘরে অর্থাভাব ছিল না। সেই আর্থিক সচ্ছলতাকেই তিনি অপব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ তাদের। টাকার জোরে প্রক্সির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পড়াশোনার চেয়ে ভিন্ন কার্যকলাপে বেশি জড়িয়ে পড়েন তিনি। একাধিক সূত্রের দাবি, ধীরে ধীরে তিনি মাদক বহনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরে ইয়াবা সেবনে আসক্ত হয়ে পড়েন।
তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের বিতর্কিত অতীত থাকা কেউ যদি অর্থের জোরে শিক্ষকতার মতো সংবেদনশীল পেশায় ঢুকে পড়েন, তাহলে তা শুধু একটি নিয়োগের অনিয়ম নয়- ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। তাদের মতে, যে পেশা শিশুদের হাতে জাতির ভিত্তি গড়ে, সেখানে চরিত্র ও সততা প্রশ্নবিদ্ধ হলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, ‘অভিযোগ পেলে তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে। প্রক্সির মাধ্যমে কেউ উত্তীর্ণ হয়ে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘প্রক্সির মাধ্যমে সরকারি চাকরি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি যাচাই করে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষিত ব্যক্তি, সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য এবং এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর দাবি, আমান উল্লাহ নাহিন ছাত্রজীবনে উশৃঙ্খল ছিলেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবন ও পাচার চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়া বা সহায়তা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০–এর ৪১৯, ৪২০, ৪৬৫/৪৬৮, ৪৭১ ও ১২০বি ধারায় মামলা হতে পারে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ীও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রক্সির মাধ্যমে চাকরি প্রাপ্তি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বাতিলযোগ্য।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেশের অন্যতম বড় নিয়োগ প্রক্রিয়া। সেখানে প্রক্সি জালিয়াতির অভিযোগ শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি, বায়োমেট্রিক যাচাই এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি ছাড়া এ ধরনের সিন্ডিকেট বন্ধ করা কঠিন।
তাদের মতে, কক্সবাজারের এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা হবে একটি দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা। কারণ এখানে শুধু ভাড়া পরীক্ষার্থী নয়, অর্থ লেনদেন, প্রভাব খাটানো এবং পূর্বের জালিয়াতি চক্রের পুনরুত্থানের অভিযোগ জড়িত। তদন্ত কতদূর এগোয়, আর নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। এখন এটিই দেখার বিষয়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর