মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা চরমে। তেহরান ইতিমধ্যেই একাধিক আরব দেশের শহর ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এই সংঘাত কত দিন গড়াবে? আর তা কতটা ভয়াবহ আকার নিতে পারে? এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম।
ট্রাম্পের দাবি বনাম বাস্তবতার হিসাব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অভিযান শেষ করবে আমেরিকা। এমনকি এই সময়ের মধ্যে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রেও পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে তাঁর বক্তব্য।
তবে ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু তুলনায় বেশি সতর্ক সুরে জানিয়েছেন, “ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস না করা পর্যন্ত হামলা চলবে।” তাঁর স্পষ্ট বার্তা—যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলেও পিছপা হবে না তেল আভিভ।
সামরিক শক্তির তুলনামূলক চিত্র
‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স’ অনুযায়ী সামরিক শক্তিতে প্রথম স্থানে যুক্তরাষ্ট্র। তালিকায় ইজ়রায়েল ১৫তম ও ইরান ১৬তম। অর্থাৎ, সরাসরি লড়াইয়ে উভয় পক্ষই প্রায় সমশক্তিধর।
ইরানের হাতে রয়েছে প্রায় ৩,০০০ ক্ষেপণাস্ত্র, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
শাহাব-৩
সেজ্জিল
খোররামশাহর-৪
খেইবার শেকান
ফাত্তাহ-১ (হাইপারসনিক)
এই অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আধা-সামরিক বাহিনী Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি)। তাদের দাবি, ২,০০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত নিখুঁত হামলা চালানো সম্ভব।

ড্রোন শক্তি: ইরানের ‘গেম চেঞ্জার’
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কার্যকারিতা প্রমাণ করা ইরানের ড্রোনগুলিও বড় ফ্যাক্টর। উল্লেখযোগ্য মডেল:
শাহেদ-১৩৬
মোহাজের-৬
আবাবিল
ঝাঁকে ঝাঁকে এই ড্রোন উড়িয়ে ইরান শত্রুপক্ষের এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে।
হরমুজ় প্রণালী: কৌশলগত তাস
পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে ইরান। বিশ্ব তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইতিমধ্যে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
নৌবাহিনীতে রয়েছে দেশীয় প্রযুক্তির ফাতেহ ও গাদির শ্রেণির ডুবোজাহাজ এবং মাইন-সজ্জিত স্পিডবোট। পরিস্থিতি জটিল হলে এই রুট বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
রাশিয়ার সম্ভাব্য ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ সহায়তা
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানকে সহায়তা করতে পারেন বলে জল্পনা তুঙ্গে। সম্ভাব্য অস্ত্র সহায়তার তালিকায় রয়েছে:
9K720 ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্ত্র
9K333 ভারবা ম্যানপোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম
এস-৩০০ / এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স
এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান
মি-২৮ আক্রমণকারী হেলিকপ্টার
যদিও মস্কো সরাসরি জড়াবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।
আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয়তা
ইরানের মদতে ইতিমধ্যেই লেবাননের হিজবুল্লাহ ইজ়রায়েলের উত্তর সীমান্তে হামলা শুরু করেছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন এবং গাজার হামাস যুদ্ধে নামতে পারে বলে আশঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে ইজ়রায়েলকে একাধিক ফ্রন্টে লড়তে হতে পারে।
ইরানে নতুন নেতৃত্ব কাউন্সিল
খামেনেইর মৃত্যুর পর অস্থায়ী শাসনভার নিয়েছে একটি কাউন্সিল। এতে রয়েছেন:
আলিরেজা আরাফি
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান
প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেন মোহসেনি
তাঁরা আপসের পথে হাঁটবেন, নাকি ‘শেষ রক্তবিন্দু’ পর্যন্ত লড়াই চালাবেন—তা সময়ই বলবে।
মার্কিন-ইজ়রায়েল বনাম ইরান সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠছে। সামরিক শক্তি, কৌশলগত অবস্থান ও আন্তর্জাতিক মিত্রতার জটিল সমীকরণে এই যুদ্ধ কত দিন চলবে, তা নির্ভর করছে অস্ত্রভাণ্ডার, অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের উপর।
পশ্চিম এশিয়ার আকাশে আপাতত যুদ্ধের মেঘই ঘনিয়ে রয়েছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর