তিন দশকেরও বেশি সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
১৯৮১ সাল থেকে দুই দফায় রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত থাকা খামেনি প্রথমে প্রেসিডেন্ট এবং পরে ১৯৮৯ সালে বিপ্লবী নেতা রুহোল্লাহ খোমেনি–এর মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন।
হামলায় খামেনির পাশাপাশি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)–এর একাধিক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাও নিহত হন। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত দেশজুড়ে ৭৮৭ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় অন্তত ১৬৫ শিক্ষার্থী ও কর্মী নিহত হন।
কীভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা হয়
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা Central Intelligence Agency (সিআইএ) তেহরানে শনিবার সকালের একটি বৈঠক সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে। ওই বৈঠকে খামেনি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন—এমন তথ্য ইসরাইলের সঙ্গে শেয়ার করা হয়।
হামলাটি সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে তেহরানের একটি সুরক্ষিত কমপ্লেক্সে চালানো হয়, যেখানে সর্বোচ্চ নেতা, প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয় ও বাসভবন অবস্থিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, খামেনি “আমাদের অত্যাধুনিক গোয়েন্দা ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার হাত থেকে রেহাই পাননি” এবং ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বরাত দিয়ে কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়নি। এ নিয়ে ভিন্নমুখী বক্তব্য পাওয়া গেছে।
কীভাবে হামলা চালানো হয়
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি যুদ্ধবিমান স্থানীয় সময় সকাল ৬টার দিকে ইসরাইল থেকে উড্ডয়ন করে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর তেহরানে পৌঁছে নির্দিষ্ট ভবনে উচ্চ-নির্ভুলতা সম্পন্ন দূরপাল্লার অস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
একই সময়ে মার্কিন সাইবার কমান্ড ও স্পেস কমান্ড ইরানের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করে বলে জানানো হয়। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন বলেন, “নন-কাইনেটিক” পদ্ধতিতে ইরানের যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
স্যাটেলাইট চিত্রে হামলার পর কমপ্লেক্স থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
কারা নিহত হয়েছেন
খামেনির সঙ্গে অন্তত ১৩ জন শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন:
মোহাম্মদ পাকপুর, আইআরজিসি কমান্ডার
আজিজ নাসিরজাদে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী
আলী শামখানি, জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান
আবদোলরাহিম মুসাভি, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান
সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি, আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্স কমান্ডার
ইসরাইলি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম জানিয়েছে, খামেনির ঘনিষ্ঠ বৃত্তের আরও কয়েক ডজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
পরবর্তী পরিস্থিতি
রবিবার ইরান অস্থায়ীভাবে দেশ পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের একটি নেতৃত্ব কাউন্সিল ঘোষণা করে। এতে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতোল্লাহ আলিরেজা আরাফি অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
এর মধ্যে যৌথ হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকায় আঘাত হানার অভিযোগ উঠেছে। তেহরানের গান্ধী হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, পাল্টা হামলায় ইরান ইসরাইলের পাশাপাশি কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করতেই এই অভিযান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, “মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা” না হওয়া পর্যন্ত হামলা অব্যাহত থাকবে।
সূত্র- আলজাজিরা।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর