মো: সাইফুল আলম সরকার, ঢাকা: "বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সংঘটিত নির্বাচন-সম্পর্কিত সহিংসতা” বিষয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন উপস্থাপন করে ইকুইটাস ফাউন্ডেশন নামের একটি হিউম্যান রাইটস সংগঠন (EQUITAS FOUNDATION)। আজ জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম হোসেন খাঁ হলে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই চিত্র প্রকাশ করেন।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে ফাউন্ডেশন এর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মোঃ তানভীর আহমেদ, চেয়ারম্যান - ইকুইটাস, মোঃ মাহফিজুর রহমান, ভাইস- চেয়ারম্যান ইকুইটাস, জিয়াউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক- ইকুইটাস, এস শাহরিয়ার ফিডা, এডভোকেট - ঢাকা জজকোর্ট, মোঃ আবু তাহের ভূঁইয়া, টিম মেম্বার সহ আরো অনেকে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন জনগণের মতামত প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, সংঘাত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টিহয়।
আমাদের এই প্রতিবেদনে ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সময়কালে সংঘটিত নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, হামলা, ভোটার বাধা এবং নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনার মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে। এসব ঘটনায় মোট ৭ জনের মৃত্যু এবং ১,৬০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।নির্বাচন-পূর্ব সময়ে প্রার্থিতা ঘোষণা, মনোনয়ন নিয়ে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং প্রচার-প্রচারণা কেন্দ্রিক সংঘর্ষের কারণে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। নির্বাচন দিবস এবং ভোটকেন্দ্রকে ঘিরে সংঘটিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ, ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ এবং কিছু স্পর্শকাতর আসনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি।নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রায় ৩০টি জেলায় পুনরায় সহিংসতা এবং উত্তেজনার ঘটনা দেখা গেছে, যার প্রধান কারণ ছিল নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ এবং প্রতিশোধমূলক সংঘর্ষ।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়-বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যা মোট ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ।এরপরে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ (১৭.৫%) এবং ঢাকা বিভাগ (১৫.২%)।প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করছে যে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিভিন্ন দলের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহিংসতার একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় ৯ লক্ষ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। তাদের উপস্থিতির ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার দিকে যায়নি, তবে কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে সহিংসতা প্রতিরোধে সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা গেছে।আমাদের বিশ্লেষণে নির্বাচন-সম্পর্কিত সহিংসতাকে তিনটি ঝুঁকি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে-উচ্চ ঝুঁকি, মধ্যম ঝুঁকি এবং নিম্ন ঝুঁকি।এই শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে বোঝা যায় কোন কোন এলাকায় সহিংসতার মাত্রা বেশি এবং ভবিষ্যতে কোথায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনটি আরও দেখায় যে নির্বাচন-সহিংসতা সাধারণত চারটি প্রধান ধরণে সংঘটিত হয়েছে:১. দলীয় অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ২. বিভিন্ন দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাজনিত সংঘর্ষ৩. ভোটকেন্দ্রকেন্দ্রিক অনিয়ম বা উত্তেজনা৪. নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক সহিংসতাসম্মানিত উপস্থিতি,এই প্রতিবেদন কেবল অতীতের ঘটনা তুলে ধরার জন্য নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণের একটি প্রচেষ্টা। আমরা বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে হলে নির্বাচনকে অবশ্যই সহিংসতামুক্ত এবং অংশগ্রহণমূলক রাখতে হবে ।এই লক্ষ্যে প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশও করা হয়েছে, যেমন—নির্বাচন-পূর্ব পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ জোরদার করাঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সংঘাত নিরসন ব্যবস্থা গড়ে তোলাআইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করানির্বাচন-পরবর্তী বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করাআমরা আশা করি, এই প্রতিবেদনের তথ্য ও বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের নির্বাচনী পরিকল্পনা, নীতি নির্ধারণ এবং সংঘাত প্রতিরোধে সহায়ক হবে।শেষে, গণমাধ্যমের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে- আপনারা যেন তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে সহযোগিতা করেন।সবাইকে ধন্যবাদ।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর