যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী গতবছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান তার পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনর্গঠন করছিল না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দাপ্রধান তুলসি গ্যাবার্ড। বুধবার (১৮ মার্চ) এ তথ্য প্রকাশ পায়, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু করার অন্যতম প্রধান যুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। খবর আল জাজিরা।
ট্রাম্প এবং তার শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন, যা চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ত্যাগ করে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
গ্যাবার্ড সিনেটের গোয়েন্দা কমিটিতে লিখিত সাক্ষ্যে বলেন, অপারেশন মিডনাইট হ্যামার-এর ফলস্বরূপ ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ইঙ্গিত দেয়—‘ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, তারপর থেকে তাদের সেই সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনর্গঠনের কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই অংশটি তিনি তার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত মৌখিক সাক্ষ্যে পড়েননি, যদিও এটি কমিটির সদস্যদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছিল। কেন তিনি এটি বাদ দিয়েছেন, এই প্রশ্নের জবাবে গ্যাবার্ড বলেন, তার সময় কম ছিল। তিনি এই মূল্যায়ন অস্বীকার করেননি। এ সময় ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার বলেন, আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে সেই অংশগুলো বাদ দিয়েছেন, যা ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়েছে। যদিও তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানের ‘কথিত পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেছিল।
তেহরান বহু বছর ধরে অস্বীকার করে আসছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়। পারমাণবিক ও অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরান যদি এমন চেষ্টা করেও থাকে, তবুও তা স্বল্প বা মধ্যমেয়াদে কোনো হুমকি নয়।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরোক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছিলেন, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন যে সাম্প্রতিক আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হচ্ছিল না।
এদিকে, দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা জানিয়েছে যে, যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জনাথন পওয়েল আলোচনার শেষ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি মূল্যায়ন করেন যে ইরানের অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ শুরু করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেনি।
প্রশাসন এখনো যুদ্ধ শুরুর জন্য কোনো একক যুক্তিতে স্থির হয়নি; তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনীর প্রতি সম্ভাব্য হুমকি, এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করেছে।
‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ ধারণাটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি সার্বভৌম দেশের ওপর হামলার বৈধতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে প্রেসিডেন্টরা কেবলমাত্র তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী ব্যবহার করতে পারেন। আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা বা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা কংগ্রেসের।
ইরানের সরকার অক্ষত কিন্তু মারাত্মকভাবে দুর্বল
হোয়াইট হাউস এই সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছে যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ‘কার্যত ধ্বংস’ হয়েছে, তাদের নৌবাহিনী প্রায় ধ্বংস এবং দেশটির আকাশসীমা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখনো ওই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করার সামরিক সক্ষমতা রাখে এবং তারা হরমুজ প্রণালিতে তাদের প্রভাব বজায় রেখেছে।
অন্যদিকে গ্যাবার্ড তুলনামূলক সংযত মূল্যায়ন দেন। তিনি বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং সম্প্রতি সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি ও গোয়েন্দামন্ত্রী এসমাইল খতিব নিহত হলেও, ইরানের সরকার এখনো টিকে আছে, তবে অপারেশন এপিক ফিউরির কারণে তা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, তবুও ইরান এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাতে সক্ষম এবং তা চালিয়ে যাচ্ছে। যদি এই শত্রুভাবাপন্ন সরকার টিকে থাকে, তবে তারা দীর্ঘমেয়াদে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে।
দীর্ঘমেয়াদি হুমকি ও মূল্যায়ন
গ্যাবার্ড ইরানকে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া এবং পাকিস্তানের সঙ্গে উল্লেখ করে বলেন, এসব দেশ উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ধরনের উন্নয়নে কাজ করছে; যা যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারে। ওয়াশিংটনভিত্তিক আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান যদি এমন সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে ২০৩৫ সাল বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
উচ্চপর্যায়ের পদত্যাগ
গ্যাবার্ডের বক্তব্যের একদিন আগে তার সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তা, জাতীয় কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জ্যো কেন্ট ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে কেন্ট বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না এবং ট্রাম্পের যুদ্ধের সিদ্ধান্ত তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে যুদ্ধের প্রতিবাদে প্রথম উচ্চপর্যায়ের পদত্যাগ।
গ্যাবার্ড নিজেও আগে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের বিরোধী ছিলেন। হাওয়াই থেকে নির্বাচিত সাবেক কংগ্রেস সদস্য হিসেবে তিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ত্যাগ করেন এবং আংশিকভাবে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে তাকে সমর্থন দেন। তবে মঙ্গলবার এক্সে দেয়া এক পোস্টে গ্যাবার্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন।
তিনি বলেন, আমাদের কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে, কী তাৎক্ষণিক হুমকি এবং কী নয়, তা নির্ধারণ করা এবং দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া তার দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, তার সংস্থার কাজ হলো ট্রাম্পের কাছে গোয়েন্দা তথ্য পৌঁছে দেয়া। তার সামনে থাকা সব তথ্য সতর্কভাবে পর্যালোচনা করার পর, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ইরানের এই ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থা একটি তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেছিল এবং সেই ভিত্তিতেই তিনি পদক্ষেপ নিয়েছেন, তিনি বলেন।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর