• ঢাকা
  • ঢাকা, শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৫ সেকেন্ড পূর্বে
মোঃ এস হোসেন আকাশ
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২১ মার্চ, ২০২৬, ০৮:৪০ সকাল

ঐতিহ্যে অনন্য কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ 

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

যতই সময় গড়াচ্ছে, মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের জায়গা হয়ে উঠেছে কিশোরগঞ্জ জেলার শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এ মাঠে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করা হচ্ছে। এ বছর ঈদুল ফিতরের ১৯৯তম জামাত হবে। ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিদের কাছে এ ঈদগাহ ময়দানটি ঐতিহ‌্যবাহী স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে ঈদ জামাত পড়তে আসেন শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। এ মাঠসহ আশপাশের খোলা জায়গায় নামাজ আদায় করেন ৫ লাখের বেশি মুসল্লি। প্রতি বছরই এ মাঠের কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে। নামাজির সংখ্যাও বাড়ছে। ছড়িয়ে পড়ছে মাঠের সুনাম।

লেখক ও সাংবাদিক শফিক আদনান বলেছেন, “শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ নিয়ে কোনো তর্ক চলে না। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে এটি অনন্য। প্রায় ২০০ বছর ধরে এখানে ঈদের সবচেয়ে বড় জামাত হয়ে আসছে। নতুন করে বড় ঈদগাহ মাঠ বানিয়ে ১০ লাখ বা তারও অধিক মুসল্লির জামাত করা সম্ভব, কিন্তু শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ও ভিনদেশি মানুষজন নামাজ পড়তে আসেন আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা থেকে। তাই, ইতিহাসকে কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। শোলাকিয়া শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, বাংলাদেশের জন্য এটি ঐতিহ্য ও ইতিহাসসমৃদ্ধ ঈদগাহ মাঠ।”

সবুজে ঘেরা শোলাকিয়া মাঠের পরিবেশ:

মাঠের চারপাশে বড় বড় গাছ। মাঠের মাঝেও বিভিন্ন জাতের বড় গাছের উপস্থিতি মুসল্লিদের নামাজ আদায়ে প্রশান্তি এনে দেয়। তাই, তো ঈদের দিনে দূর-দূরান্ত থেকে, এমনকি বিদেশ থেকে মুসল্লিদের আগমন এ মাঠের মর্যাদাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। বহু পর্যটক এই অভূতপূর্ব মহামিলনের দৃশ্য দেখার জন্যও উপস্থিত হন।

কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে মনোরম পরিবেশে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের অবস্থান। এই মাঠের দক্ষিণ পাশ দিয়ে নরসুন্দা নদী পূর্ব-পশ্চিমে চলে গেছে। বর্তমানে ঈদগাহটি চারদিক দিয়ে অনুচ্চ প্রাচীরে ঘেরা।

স্থানীয় মুসল্লিরা মনে করেন, ঈদের জামাত মানেই শোলাকিয়া দেশের সেরা। কারণ, শোলাকিয়ায় প্রতি বছর লাখ লাখ মুসল্লিদের যে ঢল, সেটি কৃত্রিম নয়। সেটি মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের জায়গা থেকেই তৈরি হয়। ঈদের আগের রাত থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ মাঠ ও আশেপাশের হোটেলে জমায়েত হয়। এমন অনেকেই আছেন, যারা ২০০ কিলোমিটার দূর থেকেও প্রতিবছর এ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন। শোলাকিয়া মাঠের পুরাতন কিছু গাছও ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

শোলাকিয়া মাঠের পরিধি:

শোলাকিয়া মাঠে কাতার অনুযায়ী নামাজির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০। কিন্তু, ঈদের জামাতে মাঠ উপচে চারপাশের খালি জায়গা-জমি, বাসার ছাদ, রাস্তা-ঘাটসহ বসতবাড়ির আঙিনা ভরে যায় মুসল্লিতে। ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই ঈদগাহের জমির পরিমান প্রায় ৭ একর। এর পশ্চিম সীমারেখা উত্তর-দক্ষিণে ৩৩৫ ফুট এবং পূর্ব সীমারেখা উত্তর-দক্ষিণে ৩৪১ ফুট এবং উত্তর সীমারেখা পূর্ব-পশ্চিমে ৭৮৮ ফুট ও দক্ষিণ সীমারেখা পূর্ব-পশ্চিমে ৯৪১ ফুট।

শোলাকিয়া মাঠের ইতিহাস:

ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহের সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে অনেক জনশ্রুতি আছে। জানা যায়, দেওয়ান মান্নান দাদ খান ১৯৫০ সালে জমি ওয়াকফ করেছিলেন। সে ওয়াকফনামায় লেখা আছে, ১৭৫০ সালে এ মাঠে প্রথম ঈদ জামাত হয়। তবে, এর পরের কয়েক বছরের ইতিহাস জানা যায় না। ১৮২৮ থেকে জঙ্গলবাড়ীর জমিদার এ মাঠে নামাজ পড়তে শুরু করেন। তখন থেকেই এখানে দেশের সর্ববৃহৎ জামাত হয়ে আসছে। সে অনুযায়ী, এবার শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ঈদুল ফিতরের ১৯৯তম বৃহৎ জামাত হবে।

আরেক জনশ্রুতি অনুযায়ী, ইসলামের ঐশী বাণী প্রচারের জন্য সুদূর ইয়েমেন থেকে আগত হয়বতনগর সাহেব বাড়ি বা দেওয়ান বাড়ির পূর্বপুরুষ সুফি সৈয়দ আহমেদ ১৮২৮ সালে নরসুন্দা নদীর তীরে নিজস্ব তালুকে ঈদের জামাতের আয়োজন করেন। ওই জামাতে সুফি সৈয়দ আহমেদ নিজেই ইমামতি করেন। পরে স্থানীয় হয়বতনগর দেওয়ান পরিবারের অন্যতম দেওয়ান মান্নান দাদ খানের বদান্যতায় এ মাঠের কলেবর বৃদ্ধি পায় এবং এর পরিধি বিস্তৃতি লাভ করে। দেওয়ান মান্নান দাদ খান ছিলেন বীর ঈশা খাঁর বংশধর।

শোলাকিয়ার মাঠের ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের গোড়ার দিকেও এ দেশের প্রত্যন্ত জেলা ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন রাজ্য আসাম, পাকিস্তান, ভুটান, ইরান, নেপাল, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলমানরা শোলাকিয়া ঈদগাহে ঈদের জামাতে শরিক হতেন।

হয়বতনগর সাহেব বাড়ির দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁনের নাতি সৈয়দ মো. নাদির বলেন, “আমরা খুবই গর্বিত ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া মাঠের শরিক হতে পেরে। আমার নানা এই জমি দান করেছিলেন। এই ঈদগাহ সম্পর্কে শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরেও অনেক প্রচার রয়েছে। সকলেই শোলাকিয়া মাঠকে চেনেন। এখন সরকার এই মাঠ তদারকি করছে। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে এই মাঠের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও উন্নয়ন আরো বাড়বে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই মাঠে জামাত আদায় করে ইতিহাসের স্বাক্ষী হবেন।”

শোলাকিয়া মাঠের নামকরণ:

শোলাকিয়া ঈদগাহের নামকরণের বিষয়েও েআছে নানা জনশ্রুতি। দীর্ঘকাল আগে একবার অংশগ্রহণকারী নামাজির সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাৎ ‘সোয়া লাখ’ হয়। সোয়া লাখ থেকে ‘সোয়ালাখিয়া’ উচ্চারণ পরবর্তীতে কালের বিবর্তনে ‘শোলাকিয়া’ হয়েছে।

অপর জনশ্রুতি অনুযায়ী, মোঘল আমলে এখানে পরগনার রাজস্ব আদায়ের একটি অফিস ছিল। সেই অফিসের অধীনে পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। এটা শোলাকিয়া নামের উৎস হতে পারে।

ঈদুল ফিতরে শোলাকিয়ায় মুসুল্লিদের ঢল ও থাকা-খাওয়ারসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা:

ঈদুল ফিতরের চাঁন রাত থেকেই বিভিন্ন প্রান্তের মুসল্লিদের ভিড় বাড়তে থাকে শোলাকিয়া মাঠসহ আশপাশের এলাকায়। যারা মাঠে রাত্রিযাপন করেন, তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা থাকে। ভোর হতেই শোলাকিয়া ঈদগাহ ও এর আশপাশে এক ভিন্ন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মূল শহরের চারপাশ থেকে ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তায় মানুষের ঢল নামে। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকে ভিক্ষুক ও বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার লোকজন চাঁদা আদায়ের জন্য। শহরের বিভিন্ন হোটেলে বাড়তি লোকের চাপ পড়ে এবং আশপাশের বাড়িগুলোতে আত্মীয়-স্বজনদের ভিড় হয়।

ঈদ মানেই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় লাখো মুসল্লির জামাত। এই জামাত কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে ঈদের পাশাপাশি অন্যরকম আনন্দ হয়ে ধরা দেয়। বড় জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করলে অশেষ সওয়াব পাওয়া যায়, এ বিশ্বাস থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা শোলাকিয়ায় যান। লাখো মুসল্লিকে বরণ করে নিতে প্রতিবছর মাঠকে সাজানো হয় নতুন ভাবে। মাঠে আগত মুসল্লিদের জন্য প্রতিবছর নতুনভাবে সাজানো হয় ওজুখানা ও টয়লেট। শহরের বিভিন্ন জায়গায় শোভাবর্ধনও করা হয়। প্রতিবছর দূর-দূরান্তের মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য শোলাকিয়া স্পেশাল নামে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও করে রেল কর্তৃপক্ষ।

শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত:

এ বছর শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত শুরু হবে সকাল ১০টায়। এবারের ঈদ জামাতে ইমামতি করবেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। রেওয়াজ অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে ছোড়া হয় শটগানের ৬টি ফাঁকা গুলি। নামাজের ৫ মিনিট আগে ৩টি, ৩ মিনিট আগে ২টি এবং ১ মিনিট আগে ১টি গুলি ছুড়ে নামাজ শুরুর সঙ্কেত দেওয়া হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং জেলার বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ঈদ জামাতে অংশ নেন।

শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটি:

সৈয়দ আহাম্মদ সাহেবের পর উত্তরাধিকার সূত্রে হয়বতনগর জমিদার বাড়ির তৎকালীন জমিদার সৈয়দ মো. আবদুল্লাহ ১৮২৯ থেকে ১৯২১ সন পর্যন্তু এই শোলাকিয়া মাঠে ইমাম ও মোতাওয়াল্লি ছিলেন। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে হয়বতনগর জমিদার পরিবার থেকে মোতাওয়াল্লি নিযুক্ত হয়ে আসছেন। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে মাঠ পরিচালনা হচ্ছে। শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান ব্যবস্থাপনার জন্য ৫১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি রয়েছে। ঈদের নামাজের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ড এই কমিটি করে থাকে। ২০০৯ সাল থেকে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ কমিটির সভাপতি কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।

শোলাকিয়া ঈদ জামাতে নিরাপত্তা ব‌্যবস্থা:

২০১৬ সালে শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর প্রতিবছরই বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানকে ঘিরে। মাঠে প্রবেশ করার আগে প্রত্যেক মুসল্লিকে বেশ কয়েকবার তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়। নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয় পুরো মাঠ ও আশপাশের এলাকা। নামাজের সময় বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে নিরাপত্তাবলয়ের পাশাপাশি মাঠে সাদা পোশাকে নজরদারি করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। মাঠসহ প্রবেশ পথগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার থেকেও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস‌্যরা দূরবিন নিয়ে জামাত পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়াও আকাশেও ওড়ে ড্রোন ও মাঠে থাকে পুলিশের নিজস্ব ভিডিও ক্যামেরা।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে, শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ দেশ ও দেশের বাইরেও পরিচিত লাভ করেছে বহু বছর ধরে। শুধু মুসল্লির সংখ্যা নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিকে থেকে শোলাকিয়া অনন্য।

কুশল/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ info@bd24live.com
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ office.bd24live@gmail.com