সারাদেশের মতো বরিশাল বিভাগজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে সংক্রামক রোগ হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে আটজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ২০৬ জন শিশুর শরীরে হামের ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ৭৭ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল জানিয়েছেন, আক্রান্ত ও মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, বিভাগের ভোলা জেলায় হামের টিকার সংকট রয়েছে। তবে বরিশালসহ অন্যান্য পাঁচ জেলায় টিকার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
বরিশাল বিভাগের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত তিন মাসে ১৩০ জন হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে শুধু মার্চ মাসেই আক্রান্ত হয়েছে ৮৯ জন। যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমানে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১৯ জন হাম আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
সোমবার বিকেলে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ৩৮ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ২৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত ২০৫ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ১৬০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে বরগুনায় ৮০ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ৭৪ জনের পরীক্ষায় ২২ জনের হাম এবং একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আটজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
বরিশাল জেলায় ২৯ জনের মধ্যে ২১ জনের পরীক্ষায় আটজনের হাম ও একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ছয়জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৯ জনসহ জেলায় মোট ৩৩ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ভোলায় ১৮ জনের মধ্যে ১৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তাদের একজন গুরুত্বর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এ জেলায় এখন পর্যন্ত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
ঝালকাঠিতে ১৫ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ১০ জনের পরীক্ষায় ছয়জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। সেখানে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। পটুয়াখালীতে ৩১ জনের মধ্যে ১৪ জনের পরীক্ষায় দুইজনের হাম শনাক্ত হয়েছে, ১২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পিরোজপুরে ১৬ জনের মধ্যে ১২ জনের পরীক্ষায় একজনের হাম পাওয়া গেছে, ছয়জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।
শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই শতাধিক শিশু সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়াসহ নানা উপসর্গ নিয়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসছে। গুরুত্বর রোগীদের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১৯ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। বরগুনা ও বরিশাল সিটি এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. একেএম নজমুল আহসান বলেন, হাম রোগের প্রাথমিক লক্ষণ জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়া। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
তিনি আরও জানান, ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলার টিকা নিশ্চিত করাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, হঠাৎ হাম ও রুবেলা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালগুলোতে আলাদা ওয়ার্ড চালু, নজরদারি জোরদারসহ একাধিক জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হতে পারে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়ায় ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
বরিশাল সদর উপজেলার কর্ণকাঠি এলাকার বাসিন্দা রহিম তালুকদার বলেন, সাতদিন আগে আমার নয় মাসের কন্যা শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রথমে জ্বর মনে হলেও পরে চিকিৎসকরা তা হাম বলে শনাক্ত করেন। এরপরই অন্য শিশু রোগীদের কাছ থেকে আমার শিশুকে আলাদা করে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এখানকার চিকিৎসাসেবার মান মোটামুটি ভালো।
শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মশিউল মুনীর বলেন, শিশুদের হামের টিকা নয় মাস বয়সে দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে সাত মাস বয়সের শিশুদেরও এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখছি। হাসপাতালে হামের টিকা পর্যাপ্ত রয়েছে। ওয়ার্ডটিতে বেড সংকট ছিল, তা সমাধান করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক। ছোঁয়াচে এই রোগটি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে খুব দ্রুত ছড়ায়। রোগীর সাথে একই ঘরে থাকলেও সংক্রমণ হতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে শিশুদের নিরাপদে রাখতে হবে। এছাড়া যেকোনো বয়সীর এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তিনি সবাইকে সচেতন থাকার আহবান জানিয়েছেন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর